বিনোদন

সেকরেড গেমস ১০ দিক :: সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া যেতনা যেসব কারণে

সেকরেড গেমস :: গনেশ গাইতোন্ডে

সেকরেড গেমস ওয়েব সিরিজে, নেটফ্লিক্স খুব দক্ষভাবে সিনেমার গতানুগতিক বাঁধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে এবং সিনেমা যে একটি মত প্রকাশের মাধ্যম তা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস করেছে।

ভয়ংকর সব দৃশ্য আর যথেষ্ট স্পষ্টবাদিতার সাথে ভারতীয় রাজনীতির ঐতিহাসিক কিছু রেফারেন্স দিয়ে দেখানো হয়েছে কিভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক টেনশন উস্কে দেওয়া হয় দেশটিতে। এই দুইটি বিষয় এবং আরও অনেক কিছুই প্রমাণ করে যে, বলিউড চাইলেও কখনই এত স্পষ্ট গল্প বলতে পারবেনা, যা নেটফ্লিক্স করে দেখিয়েছে “সেকরেড গেমস” ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে।

আমরা “সেকরেড গেমস” ওয়েব সিরিজের ১০টি দিক তুলে এনেছি এই নিবন্ধে। অনেকেই বলছেন, এইসব কারণে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড এই ওয়েব সিরিজটিকে এডাল্ট (A) রেটিং দিয়েও, ছাড়পত্র দিত কিনা তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এক. ভয়ংকর দৃশ্যের স্পষ্ট চিত্রায়ণ এবং রাখ-ঢাক ছাড়া ডায়ালগ

“হাম আপকে হ্যায় কোন” সিনেমার সবার প্রিয় কুকুর টাফি (tuffy) এর কথা মনে আছে? সিরিজের শুরুর দিকের দৃশ্যেই, দেখতে হুবহু ঠিক সেইরকম একটি কুকুরকে মুম্বাইয়ের একটি বহুতল ভবন থেকে ছুড়ে ফেলা হয়।

  • দশ বা বিশ তলার ওপর থেকে কুকুর পরে যাচ্ছে, পরে যাচ্ছে
  • কুকুরটির মাথা মাটিতে সজোড়ে আঘাত লেগে থেঁতলে গিয়ে রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে
  • আর “পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে” মতো করেই, স্কুলগামী শিশুদের সামনে কুকুরটি আছড়ে পরেছে
    স্কুলপড়ুয়া শিশুরা ভয়ংকর ভাবে চিৎকার করে উঠছে

এই সকল ঘটনাই, সিজিআই এর মাধ্যমে বাস্তব রূপায়ন করে বিশদ দেখানো হয়েছে।

Tuffy pichak

শুরুর দিকের এই দৃশ্যায়ন, পুরো ওয়েব সিরিজের চরিত্রই ব্যাখ্যা করে বটে। দর্শক বুঝে যান, কি ধরনের একটি সিরিজ তিনি দেখতে যাচ্ছেন। তাই বলে হলিউডের রেসিডেন্ট এভিল বা ওইরকম রক্তারক্তি কোন সিনেমাও এটি নয়। সিরিজ নির্মাতাদের ভাষ্য, যা দেখানো হয়েছে তা কাহিনীর প্রয়োজনেই দেখানো হয়েছে। ভারতীয় সেন্সর বোর্ড কি হ্যালুইন বা হরর টাইপের হলিউড ইংরেজি সিনেমার আনকাট সংস্করণকেই কখনো ছাড় দেয় না; তারা কখনোই এই রকম দৃশ্য সংবলিত কোন দেশীয় সিনেমাকে কিছুতেই ছাড়পত্র দিত না, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আর এই দৃশ্যের নেপথ্যে নওয়াজউদ্দিন এর যে ডায়ালগ রয়েছে, তা বলিউডের পিকে সিনেমাতেও নেই। আমরা সেই ডায়লগের হুবহু অনুবাদ করছি না, আশা করবো পাঠক সিরিজ দেখে নেবেন। তবে যা বলা হয়েছে তার ভাবার্থ হচ্ছে, “ তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস কর? ঈশ্বরের তাতে কিছু যায় আসে না।” অনেকেই হয়ত কিছুদিন পূর্বের আনুস্কা শর্মা অভিনীত “ফিল্লোরি” সিনেমার একটি বিষয় সম্পর্কে অবগত নন। সেখানে একটি দৃশ্য ছিল এরকম যে, অনুস্কা শর্মা মরে গিয়ে ভূত হয়ে গেছেন, এবং একটি ছেলের বাসায় চলে এসেছেন। সে ছেলেটি অনুস্কা শর্মার ভূত দেখে মন্ত্র পাঠ করছে, কিন্তু মন্ত্র শুনে অনুস্কা শর্মার ভূত পালিয়ে যাচ্ছে না। ভারতীয় সেন্সর বোর্ড লেখককে বাধ্য করেছেন এই দৃশ্য পরিবর্তন করতে। এবার বুঝুন সেই একই সেন্সর বোর্ড কি করে “সেকরেড গেমস”কে ছাড়পত্র দিত।

দুই. স্বাভাবিক আলোতে নগ্নতা প্রদর্শন এবং অতিরিক্ত যৌন আবেদনময় না করা

Kukoo Anal

বলিউড যা করে, যৌনতার দৃশ্য সমূহ হয় অতিরিক্ত রোমান্টিক করে ফেলা হয়; আর নয়তো নারীর প্রতি এক ধরনের শোষণ দেখানো হয়। কিন্তু “সেকরেড গেমস” সিরিজে যৌন মিলনের দৃশ্যকে প্রাকৃতিক এবং বাস্তব উপায়ে দেখানো হয়েছে। আর এই একটি বিষয়ই যথেষ্ট, পুরো সিরিজ কে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য।

Cowgirl Position

বলিউডে প্রায়ই সমাজের নিম্ন শ্রেনীর লোকদের অকৃত্রিম, স্বর্তঃস্ফূর্ত এবং রোমান্টিক যৌনতা দেখানো থেকে বিরত থাকে। কিন্তু বিভিন্ন রিভিউ থেকে মন্তব্য পাওয়া যাচ্চে যে, “সেকরেড গেমস” এই কাজটি সঠিক ভাবেই করেছে।

বলিউডে পর্ণ থেকে তারকা মর্যাদা পাওয়া সানি লিওনি সম্পর্কে পড়তে ক্লিক করুন

তিন. ট্রান্সজেন্ডারদের সম্মানীয় উপস্থাপনা

আজ পর্যন্ত মূল ধারার সিনেমায় ট্রান্সজেন্ডারদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেনি ও সঠিক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেয়া হয়নি। বেশির ভাগ সময়ই তাদেরকে নায়ক-নায়িকা বা কাহিনীর অপ্রয়োজনীয় কোন চরিত্রে শুধুমাত্র হিজড়ে হিসেবেই দেখানো হয়েছে। প্রায় সময়েই তাদের চালচলন, তাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা বা তাদের কাপড় পড়ার অভ্যাস – এগুলো দেখিয়ে হাসির খোরাক বানানো হয়, তাচ্ছিল্য করা হয়।

Kukoo the lucky charm

তবে “সেকরেড গেমসে” ট্রান্সজেন্ডারদের শুধুমাত্র স্বাভাবিক রূপে উপস্থাপন করে থেমে থাকেনি। ভারতবর্ষে তাদের অদ্ভুত প্রকৃতিগত অবস্থাকে ভাগ্য-কবজ হিসেবে ব্যবহার করা হয় , সেই দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়াও একজন ট্রান্সজেন্ডার কে পাওয়ার আকাঙ্খায় জন্য দুইজন ডনের প্রতিযোগিতা বৈচিত্র্যপূর্ণ বটে। সর্বোপরি, গল্পের একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন ট্রান্সজেন্ডারের প্রেমে ব্যাকুল হওয়া কিংবা তাঁর মৃত্যুতে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠা দর্শকের মানসে গভীর রেখাপাত করবে।

চার. সিরিজের হিরোদের অপ্রতিরোধ্য বা অজেয় হিসেবে না দেখানো

Sartaj thumb cut

বলিউডের নায়ক আজ কখনোই ব্যথা পান না। কিন্তু “সেকরেড গেমস” ওয়েব সিরিজের সাইফ আলী খান অজেয় নন, কারণ সেকরেড গেমস কোন গতানুগতিক হিন্দি সিরিজ নয়। এই সিরিজে শেষের দিকে একটি বীভৎস দৃশ্য রয়েছে যেখানে দেখা হয়েছে, সাইফ আলী খানের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি লিউক কেন (ম্যালকম মুরাদ) কুড়ালের কোপে আলাদা করে ফেলছেন। নায়ক সাইফ আলী খানকে একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার গালি দিচ্ছেন, টয়লেটে ফেলে কিল-ঘুষি-লাথি মেরে নাক ফাটাচ্ছেন, তবুও নায়ক রেগে গিয়ে রজনীকান্ত হচ্ছেন না।

পাঁচ. সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র সমূহ অমর না করা

হালের গেম অফ থ্রোনস ছাড়া আর কোন সিরিজেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মৃত্যু দেখা যায়নি। হিন্দি সিনেমা বা সিরিয়ালে যেখানে প্রায়শই পুনর্জন্ম কিংবা প্লাস্টিক সার্জারি করে চলে আসা একটা আর্ট ফর্মে হিসাবে প্রতিষ্ঠা পয়ে গেছে বলা যায়।

Gaitonde Suicide

কিন্তু “সেকরেড গেমস” সিরিজের প্রথম পর্বের শেষেই গণেশ গাইতোন্ডে (নওয়াজউদ্দিন) আত্মহত্যা করেন। সিরিজে ‘র’ এর এজেন্ট অঞ্জলি মাথুর (রাধিকা আপটে) সিরিজটির শেষ দিকে ম্যালকম মুরাদের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক থেকে ছোড়া গুলিতে নিহত হন।

Point Blank

এমনটি ভাবা মোটেও কঠিন হবে না যে, পরবর্তী দ্বিতীয় সিজনে বাদবাকি কেন্দ্রীয় চরিত্র যেমন সাইফ আলী খান মরে যাবেন।

ছয়. ঐতিহাসিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঘটনার উল্লেখ

সিরিজটিতে বেশ কয়েকবার ভারতীয় ইতিহাস এবং রাজনীতিবিদদের বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। যেসব ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম

  • কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেয়ের অপহরণ
  • ইন্দ্রিরা গান্ধির জরুরী আইন জারী
  • সরকারীভাবে পুরুষদের বন্ধ্যাত্বকরণ প্রকল্প
  • শাহ বানু মামলার রায় ও রাজীব গান্ধী
  • রাজীব গান্ধীর বোফর্স ট্যাংক কেলেংকারী
  • বাবরি মসজিদ
  • মণ্ডল কমিশন সংশ্লিষ্ট আত্মাহুতি

এবং ব্লার বা ঘোলাটে না করেই উল্লেখিত ঘটনার বেশ কিছু আসল ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। খোদ ভারতেই প্রদর্শিত হয়নি এমন কিছু ফুটেজ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

পিতার সম্পর্কে নানান মন্তব্য, কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধী স্বাভাবিক নিয়ে টুইট করেছিলেন, আর খুশিও হয়েছেন নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যাপ।

সাত. বলিউড তারকাদের হার্ড ড্রাগস ব্যবহারের দৃশ্য

Snorting hard drugs

বলিউড নির্মাতারা মাদক ও সেটির ব্যবহারের দৃশ্য তাদের সিনেমা দেখান ঠিকই, কিন্তু নিজেদের বলিউড তারকাদের মাদক ব্যবহারের গল্প বা সেরকম কোন দৃশ্যের অবতারণা সিনেমাতে হয় না বললেই চলে। যদিও সাম্প্রতিক সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক সঞ্জু তার ব্যতিক্রম ছিল। অনুরাগ কাশ্যাপ দেখিয়েছেন, বলিউডে প্রতিষ্ঠিত এক পিতার – বখে যাওয়া এক ছেলেসন্তান কিরকম নির্দ্বিধায় কোকেন সেবন করছেন আর সহ-অভিনেত্রিকে নিপীড়ন করছেন।

আট. ভারতীয়দের মধ্যে সেক্স ফেটিশের প্রভাব প্রদর্শন

Fetis and dildo

যদিও ভারতীয় সমাজের কিছু অংশ মনে করেন বিডিএসএম (যৌন চর্চার একটি রূপ) একটি ভিনদেশি ধারণা যা হলিউড সিনেমা “ফিফটি শেডস অফ গ্রে” এর মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছে – আদতে এটি সত্যের অপলাপ মাত্র যা সেকরেড গেমসে দেখানো হয়েছে।

নয়. অজ্ঞাতসারে সহজাত বা প্রকৃতিজাত ওয়ে ওঠা বর্ণবাদী আচরণ

আমাদের মধ্যে অনেকেই অজ্ঞাতসারেই বর্ণবাদ আত্মস্থ করে ফেলেছি, অনেক সময় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদল করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই, যদি আমরা সত্যিকারের মানুষ হতে চাই।

Bengali bura

কনস্টেবল কাটেকার এর চরিত্রটি ঠিক এই রকম। সিনিয়র অফিসার সাইফ আলি খানের প্রতি অনুগত একজন নিবেদিতপ্রাণ পুলিশ। সিরিজের পুরোটাই তিনি নিজের স্ত্রী-সন্তানদের প্রচণ্ডরকম ভালবাসতে জানা একজন ভালো মানুষ। অথচ তিনিও নিজের অজান্তে  (তথাকথিত!) বাংলাদেশী রিফিউজিদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করেন। তার বর্ণবাদ আচরণের কারণে একজন মানুষের জীবন চলে যাওয়ার পর তিনি ভুল বুঝতে পারেন।

দশ. ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের স্পষ্ট উদাহরণ প্রদর্শন

জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কীলক লাগানোর জন্যে ধর্মকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই কূটকৌশল সিরিজে খুব সাহসিকতার সাথে চিত্রায়ন করা হয়েছে।

A chicken in veg thali
সিরিজের চরিত্র গনেশ গায়তোন্ডে ব্যক্তি আক্রোশের বশবর্তী হয়ে, একটি নিরামিষাশী হিন্দু হোটেলের মালিককে সায়েস্তা করতে, খাবারের মধ্যে মুরগীর হাড় মিশিয়ে দেয়। আর মুখে বলে, একটি মুরগীর হাড় হিন্দু হোটেলের যে ক্ষতি করতে পারে তা কোন গ্যাংস্টার করতে পারবে না।

সেকরেড গেমস এর মাধ্যমে Netflix উপমহাদেশে এমন একটি সিরিজ উপহার দিয়েছে যা পশ্চিমা সিরিজের সমতূল্য বলা না গেলেও, এই তল্লাটের যে কোন সিরিজের তুলনায় অনেক বেশী মানসম্পন্ন এবং সততার দিক দিয়ে আনকোরা উচ্চতা ছুঁয়েছে বলা যায়।

সর্বশেষ ছবিটি উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া। বাকি সবগুলো ছবি, নেটফ্লিক্স থেকে ধারণকৃত স্ক্রিনশট। পাঠকদের অনুরোধ করবো, সেকরেড গেমস সম্পর্কে আপনাদের মতামত থাকলে এখানে লিখুন।

 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top