জানা-অজানা

নিলামে মানবদেহের ১০ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

নিলামে মানবদেহের ১০ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

নিলামে মানবদেহের ১০ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে ভাবা যায়? পৃথিবীতে নিলামে আপনি অনেক আজব জিনিস কিনতে পারবেন, তাই বলে মানুষের অঙ্গ? অবাক করা বিষয় হচ্ছে, মানুষের দেহাবশেষ সহ বেশ কিছু অবিশ্বাস্য আইটেম বিক্রি করা হয়েছে নিলামে। ঐতিহ্যবাহী নিলাম ঘর বা নানান অনলাইন বিক্রেতারা বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হাজির করেছে বেশি মুনাফার জন্য।

এই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা টুকরার মধ্যে রয়েছে একটি খুলে আনা মুণ্ডু, ঘিলু, চুলের বেণী এবং চুলের গোছা, দাঁত, একটি হাত, একটি আঙুল, একটি বৃদ্ধাঙ্গুল, একটি পা, সমগ্র মাথার খুলি, এমনকি একটি লিঙ্গ রয়েছে এই তালিকায়। মনে হচ্ছে সবকিছুরই মূল্য আছে; আর কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও, এগুলো কেনার জন্য অপেক্ষায় আছে।

খুলে আনা মুণ্ডু

২৯ শে মে, ২০১১ তারিখে, অ্যাসিসির সেন্ট ভাত্তিলের (১২৯৫-১৩৭০) শিরচ্ছেদ করা  মাথা (প্রকৃতপক্ষে, মাথার খুলি), আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি মেথের নিলামঘরে নিলামে রাখা হয়েছিল। পারিবারিক কিছু ধ্বংসাবশেষের সাথে মাথাটি একটি কুইনাইন বাক্সে সংরক্ষিত ছিলো। জিনগত রোগে আক্রান্ত লোকটি একজন সন্ত ছিলেন; অ্যাঙলো-আইরিশ এক পরিবার মাথাটি বিক্রির জন্যে নিলামঘরে দিয়েছিলো। প্রস্তাবিত বস্তুগুলোর ধার্য্য কৃত মূল্য রাখা হয়েছিল ৮০০ থেকে ১২০০ ইউরোর মধ্যে।

দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত একজন ইতালী তপস্বী, সন্ন্যাসী ১৩৭০ সালে মারা যান। যদিও তার যৌবনকাল “অনৈতিক কাজ ও ব্যাভিচার” পূর্ণ ছিল, তবে ভাত্তিল পরে তার সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে বেশ কিছু তীর্থস্থানে তীর্থ যাত্রায় যান এবং জীবনে পরে সন্ত হন। কেউ জানে না তার মাথা আয়ারল্যান্ডে কী করে আসে, কিন্তু ওই পরিবারটি জানায় ১৮ শতকে “ইউরোপে ‘গ্র্যান্ড ট্যুর’ থেকে এটি অর্জন করা হয়েছিলো।

একজন হলিউড অভিনেতা ৩৫০০ ইউরোতে, ধার্য্য কৃত মূল্য থেকে চারগুণ বেশি দিয়ে খুলিটি কিনে নেন। এর ক্রেতা জানান, এই মাথার অবিশ্বাস্য মূল্য দিয়ে কিনে নিতে চেয়েছিল কেউ। ১০,০০০ ইউরো মূল্য দিতে চাইলেও বিক্রি করা যায়নি, কারণ মাথাটি আয়ারল্যান্ডের বাইরে নিতে চেয়েছিল ওই ক্রেতা।

মস্তিষ্ক

ফ্রান্সের নিলামকারী সংস্থার সম্মানিত প্রেসিডেন্ট এডুয়ার্ড গিয়ার্র বলেন, বিখ্যাত ফরাসী জ্ঞানসাধক ও লেখক ফ্রাঙ্কোজ-মেরি আরুয়েত (১৬৯৪-১৭৭৮) এর মস্তিষ্কটি নিলামে বিক্রি হয়েছিল। যিনি কলাম লেখক ভলতেয়ার নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তার উত্তরাধিকারী এবং ফরাসি সরকারের মধ্যে তার ‘হৃদয় এবং মস্তিষ্ক কোথায় রাখা হবে’ এ নিয়ে বিতর্ক তৈরী হয়। তার মস্তিষ্ক আর হৃদয় এলক‌োহলে ফুটিয়ে (সেদ্ধ) করা হয় পচন রোধ করতে। অতঃপর তার মস্তিষ্ক নিলামে তোলা হয় আর তার হৃদয়টি তারই প্রমাণ সাইজের মূর্তির বেদীতে রেখে দেওয়া হয়।

নিলামে মানবদেহের ১০ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

ইটালিয়ান একনায়ক বেনিটো মুসোলিনির রক্ত ​​ও মস্তিষ্ক (১৮৮৩-১৯৪৫) একটি ইবে নিলামে বিক্রি করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। তার নাতনী অ্যালেসান্দ্রা মুসোলিনির মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে মুসোলিনি নিহত হওয়ার পর, মিলানের একটি হাসপাতালে তার দেহটি ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল, সেখান থেকে দেহটি চুরি হয়েছিল। স্বৈরশাসকের রক্ত ​​ও মস্তিষ্কের প্রাথমিক মূল্য চাওয়া হয়েছিল ২২,২৯০ ইউরো, তবে ইবে এই নিলাম প্রত্যাহারের আগে এর মূল্য ১৫,০০০ ইউরোতে নেমে গিয়েছিল। প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে তারা বলেছিল যে “কোনও মানবিক জৈব উপাদান” নিলাম কোম্পানির নীতির লঙ্ঘন করে।

চুলের বেণী

ভারতে, হিন্দু তীর্থযাত্রীরা শ্রী ভেঙ্কটেশ্বরের নিকট উপহার হিসাবে তাদের চুল কেটে প্রদান করেন। ভেঙ্কটেশ্বেরকে ভগবান বিষ্ণুর একটি অবতার মনে করা হয়। অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুমালাতে শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে এই চুল সংগ্রহ করা হয়, এবং তা শ্রেণীবিন্যাস করে বিক্রি করা হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন ৯০০ কিলোগ্রাম (১,৯৮৪ পাউণ্ড) চুল বিক্রি করে। ২০১৩ সালে ২০০ কোটি রুপীর চুল বিক্রি করা হয়েছিলো।

নিলামে মানবদেহের ১০ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

তিরুমালায় চুলের বিসর্জন

সেলিব্রেটিদের চুলও ভাল দামে বিক্রি হয়। ২০০২ সালে গায়ক ওয়েইলন জেনিংস মারা গেলে, তার সম্পত্তি একটি ইবে নিলামে বিক্রি হয়। এর মধ্যে তারকা সঙ্গীতশিল্পী উইলি নেলসন এর চুলের বেণীও ছিল। মাদকদ্রব্যে ছেড়ে দেওয়ায় উপহার হিসেবে জেনিংসকে তিনি দিয়েছিলেন। চুলের বেণীটি বিক্রি হয় ৩৭,০০০ ডলারে।

 

দাঁত

অভিনেতা কোরি হেইম (১৯৭১-২০১০) ২০০১ সালে তার পরে যাওয়া একটি দাঁত নিলাম করার চেষ্টা করেন। চুক্তি আরও মধুর করতে, তিনি এতে অন্তর্ভুক্ত করে তার কিছু চুল।

প্রাথমিকভাবে, তার আইটেমগুলো আপলোড করা কঠিন হয়ে পরেছিল; ইবে হেইম এর নিলামের সমাপ্তি ঘটায়, কারণ মানুষের জৈব উপাদান বিক্রি করা তাদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে। হেইম তারপর অন্য একটি ওয়েবসাইটে “অপ্রকাশিত” দামে দাঁত বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

হাত

২০০৭ সালে, আইএম চেইত গ্যালারি নিউ ইয়র্কের পঞ্চম অ্যাভিনিউতে “প্রাকৃতিক ইতিহাস” বিষয়ক নিলামের জন্য একটি শোরুম ভাড়া করে। বিক্রি আইটেম মধ্যে ছিল একটি মিশরীয় মমি হাত। ধারণা করা হয়েছিল রিপলি’স বিলিভ অর নট! সংগঠন হাতটি কিনে নিবে, কিন্তু অ্যান্ডার্স কার্লসন, যিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা গ্যালারির স্বত্বাধিকারী ৪,৫০০ ডলারে ভয়ানক বস্তুটি কেনেন।

মানুষের শরীরের অংশ বিক্রি করার বিরুদ্ধে কোম্পানির নীতি থাকার কারণে হাত ইবেতে দেওয়া যায় না। কার্লসনের ক্রয়ের আগে, নিউ জার্সির প্রাচীন জিনিসপত্রের এক ডিলারের মালিকানাধীন ছিল, যা তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে পেয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কের এক সংগ্রাহক, এই হাতটি এনেছিলেন। পরে অবশ্য, মিশর “তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রপ্তানি” অবৈধ ঘোষণা করে।

আঙুল, বৃদ্ধাঙ্গুল, এবং দাঁত

বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি (১৫৬৪-১৬৪২) এর একটি আঙুল, একটি বৃদ্ধাঙ্গুল ও দাঁত, ২০০৯ সালে একটি শিল্প সংগ্রাহকের কাছে পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর ৯৫ বছর পর পর্যন্ত, ক্যাথলিক চার্চ গ্যালিলিওর দেহকে পবিত্র ভূমিতে সমাহিত করার অনুমতি দেয়নি কারণ তিনি চার্চের মতবাদের বিরোধীতা করেছিলেন। ১৭৩৭ সালে, চার্চ সন্তুষ্ট হওয়ার পর গালিলিও এর বিলম্বিত শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের সময়, বিজ্ঞানী-ইতিহাসবিদ গিওভানি ত্যাগিওনি বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর মৃতদেহ থেকে “দুটি আঙুল, দাঁত এবং একটি মেরুদন্ডের অস্থিসন্ধি” কেটে নেন।

নিলামে মানবদেহের ১০ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর একটি আঙুল

১৯০৫ সালে হারিয়ে যাওয়ার আগে আঙুল, বৃদ্ধাঙ্গুল এবং দাঁত কয়েকবার হাতে বদল হয়েছিল। পরে তা পাওয়া গেলে, একটি নিলামে এক সংগ্রাহকের কাছে “অজ্ঞাত জিনিসপত্র” হিসাবে বিক্রি হয়। গ্যালিলিওর শরীর থেকে খুলে আনা অন্য আঙ্গুল এবং মেরুদন্ডের অস্থিসন্ধি” ১৭৩৭ সাল থেকে ফ্লোরেন্স ও পাদুয়াতে জাদুঘরে মমি অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।

পা

২০০৬ সালে বিমান দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হন জন উড। একই প্লেনে আর পাশের সিটে বসা তার বাবা সেই দুর্ঘটনায় নিহত হন। এক বছর পর, আঘাতের কারণে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। মৃত্যুর পর পুরো শরীরের সাথে নিজের পা কবরে নিয়ে যেতে তিনি কাটা অঙ্গটি একটি বারবিকিউ ওভেনে মধ্যে সংরক্ষণ করে রেখে দিয়েছিলেন। জন উড অর্থাভাবে পরলে অনেক কিছুর সাথে ওই বারবিকিউ ওভেনটিও বিক্রি করে দেন, কিন্তু নিজের পা সরাতে ভুলে যান।

শ্যানন হোসম্যান্ট একটি পর্যটক আকর্ষণ হিসেবে প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে উডের মমি করা পাটি কিনে আনেন পরে উড এই পা ফেরত পাওয়ার জন্য জাজ ম্যাথিস রিয়েলিটি টিভি প্রোগ্রামে হাজির হন এবং সফল হন।

শিশ্ন

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট লম্বা ছিলেন না, এবং তিনি শারীরিক গঠনেও নিখুঁত ছিলেন না। তার ময়নাতদন্তের সময় তার হৃদয় এবং অন্যান্য অঙ্গের সাথে তার লিঙ্গটিও, ডাক্তাররা সরিয়ে ফেলেন। ফরাসি সম্রাটের এই লিঙ্গ ঘটনাক্রমে শেষ পর্যন্ত এক ইতালীয় যাজকের দখলে আসে, তার পরিবার এইটি লন্ডনে বই বিক্রেতার কাছে “মমি করা কণ্ডুরা” হিসাবে বিক্রি করে দেয়। পরবর্তিতে এই ক্রেতা, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়ার একটি বইয়ের দোকানের মালিকের কাছে এইটি বিক্রি করে। ১৯২৭ সালে, এইটি নিউইয়র্ক সিটিতে জাদুঘর মিউজিয়াম অফ দ্যা ফ্রেঞ্চ আর্টসে পরিদর্শন করা হয়েছিল। অবশেষে, নেপোলিয়ন এর লিঙ্গ ১৯৭৭ সালে আমেরিকান ইউরোলজিস্ট জন লেটিমারের কাছে এক নিলামে বিক্রি হয়েছিল।

 

To Top