ইতিহাস

নুরবানু সুলতান: অটোমান সাম্রাজ্যের জনদরদী সুলতানা

নুরবানু সুলতান

নুরবানু সুলতান ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যাক্তিদের অন্যতম একজন। অটোমান ইতিহাসে “সালতানাত ই সুলতানা” অর্থ্যাৎ “সুলতানাদের রাজত্ব” যুগের অন্যতম ক্ষমতাশালী শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং হুররাম সুলতানের সন্তান দ্বিতীয় সেলিমের প্রিয় উপস্ত্রী এবং পরবর্তীতে ‘হাছেকি সুলতান’ ছিলেন। তবে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় যখন তিনি তৃতীয় মুরাদের ওয়ালিদে সুলতান হন। নুরবানু সুলতান তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওয়ালিদে সুলতান হিসেবে প্রাসাদে রাজত্ব করেছেন। তার স্বামী এবং পুত্র দুইজনের রাজত্বকালে অটোমান দরবারে নুরবানু সুলতানের জোরালো প্রভাব ছিল।  তার শাশুড়ি হুররাম সুলতানের মতই তিনিও জনহিতৈষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তার জীবনকালে মক্তব, হাম্মামখানা এবং লঙ্গরখানা নির্মাণ করেছিলেন। তবে তিনি বিখ্যাত আতিক ওয়ালিদে মসজিদ নির্মাণের জন্যেই সর্বাধিক পরিচিত।

ইশ্বরের নিষ্পাপ আলো

নুরবানু সুলতান একটি অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৫২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পরে তার নাম ছিল সিসিলিয়া ভেনিয়ার বাফো। তিনি ছিলেন পেরস দ্বীপের ডিউক, নিক্কোলো ভেনিয়ারের অবৈধ সন্তান। মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৫৩৭ সালে অটোমান নৌ-সেনাপতি বারবোসা-হায়ারুদ্দিন পাশা তাকে ধরে নিয়ে আসেন। অভিজাত পরিবার থেকে দাসীতে পরিণত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল তার জন্য বেশ বেদনাদায়ক। তবে নুরবানু সুলতান নিজেই তার অবস্থান তৈরী করে নিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতি ছিলেন। তার রূপ এবং গুণ দেখে হুররাম সুলতান যিনি সুলতান সুলাইমানের (সুলাইমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট) হাছেকি সুলতান তার পুত্র শাহজাদা সেলিমের উপস্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। হুররাম সুলতান তার নাম দেন “আফিফে নুরবানু”। “আফিফে” অর্থ নিষ্পাপ এবং “নুর” অর্থ হল “ইশ্বরের আলো”। মানিছায় নুরবানু সুলতান শাহজাদা সেলিমের নজরে আসেন এবং তিনি একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন। নুরবানু সুলতান তিনটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে ১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। মানিছায় শাহজাদার হারেমের থাকাকালীন সময়ে হুররাম সুলতানের সাথে নুরবানু সুলতান ভাল সম্পর্ক রেখেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তার শাশুড়ির পদানুসরণ করেছিলেন।

নুরবানু সুলতান

সুলতান দ্বিতীয় সেলিম

১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে ৪২ বছর বয়সে সেলিম সিংহাসনে বসলে, তার পুত্র মুরাদ তার পিতার উত্তরাধিকারী হন। মুরাদ একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়াতে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নিশ্চিত করতে সুলতান দ্বিতীয় সেলিম আরও পুত্র সন্তান লাভের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং এর জন্য আরও উপস্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। সুলতানের আরও উপস্ত্রী গ্রহণের পরেও নুরবানু সুলতানের অবস্থান অটুট ছিল। এরপরেও নুরবানুই ছিলেন হারেমের প্রধান। আর তিনিই ছিলেন সুলতানের প্রিয় এবং স্নেহভাজন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে, দ্বিতীয় সেলিম নুরবানু সুলতানকে বিয়ে করলে তিনিই হন তার রানী। অটোমান প্রাসাদে জীবনের চড়াই উতড়াই এ নুরবানুর সঙ্গী ছিলেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এস্থার হানদালি, যিনি ছিলেন একজন রত্ন ব্যবসায়ী। যিনি নুরবানুর বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করতেন। নুরবানু অনেক বিষয়ে এস্থার হানদালির উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাদের বন্ধুত্ব এতটাই ঘনিষ্ট ছিল যে তাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রাসাদে অনেক রকমের গুজব রটেছিল। শেষ বয়সে হারেমে আধিপত্য বিস্তারে তিনি তার পুত্রবধূ সাফিয়া সুলতানের সাথে বিবাদে জড়িয়েছিলেন। তবে সাফিয়া সুলতান তার শাশুড়ি নুরবানু সুলতান সম্পর্কে যে ইঙ্গিত করেন তা হল,

আমি নুরবানু সুলতানকে তার মধ্য বয়সে দেখেছি। তার বৃদ্ধ বয়সেও তিনি ছিলেন আমার সমগ্র জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী।

বিচক্ষণতায় সেরা সুলতানা

নুরবানু সলতান

সুলতান তৃতীয় মুরাদ

১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে সেলিমের মৃত্যু হয়েছিল, নুরবানু তার পুত্রের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে এ মৃত্যুর খবর গোপন করেছিলেন। মুরাদ রাজধানীতে ফেরার আগ পর্যন্ত তিনি সুলতান সেলিমের মৃতদেহ বরফে সংরক্ষণ করেছিলেন। এমন কি উজিরে আজম সকুল্ল মেহমেদ পাশার কাছ থেকেও সুলতানের মৃত্যুর খবর গোপন করেছিলেন। অবশেষে তৃতীয় সেলিমের মৃত্যু ১২ দিন পর, মুরাদ রাজধানীতে ফিরেছিলেন এবং  বিনা রক্তপাতে সুলতান হিসেবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। একারণে, সুলতান তৃতীয় মুরাদ তার মায়ের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং অনেকক্ষেত্রে নুরবানু সুলতানের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। মুরাদ সুলতান হলে নুরবানু হন ওয়ালিদে সুলতান, দরবারে তার প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল, সেই সাথে তিনি হয়ে উঠেন অটোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী।

ওয়ালিদে সুলতান হিসেবে নুরবানু সুলতান ছিলেন একজন বিচক্ষণ কূটনীতিবিদ। তিনি শুধু অটোমান বিষয়েই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি ক্রীতদাস উদ্ধার এবং ইহুদী ব্যবসায়ীদের সুরক্ষার বিষয়েও মনোযোগী ছিলেন। তিনি ভেনিস এবং ফ্রান্সের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখে ছিলেন। ফ্রান্সের রানী ক্যাথরিন ডি মেডিসির সাথেও তার ভাল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। নুরবানু সুলতান তাদের সম্পর্ক অটুট রাখতে এবং দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে ফরাসি বাণিজ্যিক সুবিধা নতুন মাত্রায় নিতে ক্যাথরিন ডি মেডিসিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে তুরস্ক-ভেনিস এবং মিশর-ভেনিস সম্পর্কে শান্তি বজায় রাখতে নুরবানু সুলতানের প্রভাব ছিল।

মানবদরদী নুরবানু সুলতান

নুরবানু সুলতান

নুরবানু সুলতানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।

নুরবানু সুলতান তার দাতব্য দানের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তার দানের অন্যতম নিদর্শন পাওয়া যায় এশীয় অংশে অবস্থিত উস্কুদারে, যেখানে তিনি মসজিদ, স্কুল, হাম্মামখানা এবং লঙ্গরখানা নির্মাণ করেন। নুরবানু সুলতান ছিলেন প্রথম নারী যিনি ইস্তাম্বুলের রাজধানীতে গ্রন্থাগার নির্মাণ করেছিলেন। নুরবানু প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারে রাখা হয়েছিল ১৬ শতকের এবং নুরবানু সুলতানের নিজের অনুমদিত ১৬টি কোরআন শরীফ। তার নিদর্শন এখনও বর্তমান তা হল আতিক ওয়ালিদে মসজিদ, যার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে, একই বছর নুরবানু সুলতানের মৃত্যু হয়েছিল। আতিক ওয়ালিদে মসজিদ নকশা করেছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের মহান স্থপতি সিনান পাশা। ৮০ বছর বয়সে সিনান পাশা এটা নকশা করেন, সম্ভবত এটাই তার সর্বশেষ কাজ ছিল। নুরবানুর এই মসজিদটিই ছিল কোন নারীর আদেশে রাজধানীতে নির্মিত দুই মিনার বিশিষ্ট প্রথম মসজিদ।

নুরবানু সুলতানের মৃত্যু হয় ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে। মৃত্যুর পরে তাকে অনেক সম্মান জানানো হয়েছিল। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সুলতান মুরাদের প্রাসাদে অবস্থান করার কথা থাকলেও, তিনি তা না করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেন। মেহমেদ মসজিদে নেওয়ার সময় তিনি মায়ের কফিনের সাথে পায়ে হেটে কাঁদতে কাঁদতে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর্যন্ত সাম্রাজ্যের উচ্চ-পদস্থ কর্মচারী এবং ধর্মীয় নেতাদের নুরবানু সুলতানের সমাধীতে শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করেছিলেন। সুলতান মুরাদ ঐতিহ্য ভেঙে তার মাকে তার পিতার সাথে সমাধিস্থ করেছিলেন। নুরবানু সুলতান সাম্রাজ্যের প্রথম উপস্ত্রী, যাকে সুলতানের সাথে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। যদিও তিনি তার প্রজন্মের অন্যান্য মহান সুলতানাদের মত বেশি পরিচিত নন, তবুও একারণে তিনি অটোমান ইতিহাসে অন্যতম মহান সুলতানা ছিলেন। তিনি ছিলেন তার সময়কার অন্যান্য নারীদের মতই ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী, অটোমান সাম্রাজ্যের দরিদ্রদের প্রতি তার সমবেদনা ও দানের কারণে তিনি ইতিহাসে মানবদরদী হিসেবে খ্যাত।

নুরবানু সুলতান

হাজিয়া সোফিয়ার প্রাঙ্গণে সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের সমাধির পাশেই সমাহিত করা হয় নুরবানু সুলতানকে।

তথ্যসূত্র:

  • Peirce, Leslie P. Imperial Harem: Women and Sovereignty in the Ottoman Empire. Oxford University Press, 1994.
  • Empress of the East How a European Slave Girl Became Queen of the Ottoman Empire. Basic Books, 2017.
  • Kayaalp-Aktan, Pinar. The Atik Valide Mosque Complex: A Testament of Nurbanu’s Prestige, Power and Piety. ProQuest Dissertations Publishing, 200
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top