ইতিহাস

সুলতান প্রথম মোস্তফা: এক উন্মাদ অটোমান শাসকের গল্প

সুলতান প্রথম মোস্তফা

অটোমান সুলতান প্রথম মোস্তফা (১৫৯২-১৬৩৯) জন্ম থেকেই মানসিকভাবে দূর্বল এবং অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু জানালাবিহীন এক বিশাল কক্ষের  “কারাগার” এ থাকা বছর গুলোতে তার মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করেছিল। তিনি প্রায়শই “উন্মাদ ও নির্বোধের মত হাসতেন”, এ অবস্থাতেই, তিনি দুই বার সুলতান হিসেবে ঘোষিত হয়েছিলেন। তিনি এমনই মানসিক অসুস্থ ছিলেন যে, উন্মাদের মত প্রাসাদময় দৌড়ে বেড়িয়েছেন, ক্ষমতার ভার থেকে মুক্ত করতে তার খুন হওয়া ভ্রাতুষ্পুত্রের কাছে আকুতি মিনতি করেছিলেন। অনেকে তাকে পাখি এবং মাছকে স্বর্ণের মোহর ছুড়ে দিতে দেখেছেন।

১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে যখন সুলতান প্রথম আহমেদ (১৫৯০-১৬১৭) সিংহাসনে বসেন, তিনি তার ১১ বছর বয়সী ভাই মোস্তফাকে কারাগারে বন্দি করেন এবং কারাগারের ঢোকার পথ দেয়াল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মোস্তফা সম্ভবত কারাগারে বন্দি হওয়ার আগে থেকেই মানসিক ভাবে দুর্বল এবং অসুস্থ ছিলেন। কারাগারে তিনি যে মানসিক ও সামাজিক বঞ্চনার স্বীকার হয়েছিলেন তা তার মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসে তাকে “মস্তিষ্কবিকৃত” বলে বর্ণনা করা হয়েছে, কারণ তিনি সিংহাসনচ্যুত বা খুন হওয়ার ভয়ে সবসময় ভীত থাকতেন – যদিও তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করলে তার এই আচরণ অদ্ভুত ছিল না।

Mustafa I by John Young

সুলতান প্রথম মোস্তফা

সুলতান প্রথম আহমেদ প্রতিরাতে ভিন্ন নারীদের সাথে রাত কাটালেও, দুইজন নারী তার প্রিয় ছিল: মাহফিরোজে এবং কোসেম সুলতান (১৫৮৯-১৬৫১)। মাহফিরোজে ছিলেন দ্বিতীয় ওসমান (১৬০৪-১৬২২) এর মা এবং কোসেম জন্ম দিয়েছিলেন চতুর্থ মুরাদ (১৬১২-১৬৪০), বায়েজিদ এবং ইব্রাহিম (১৬১৫-১৬৪৮)। ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দে ২৮ বছর বয়সে সুলতান আহমেদ মারা গেলে, ক্ষমতাধর সুলতানা কোসেম, তার জেষ্ঠ্য সন্তান, ওসমানকে সিংহাসনে বসাতে বিরোধীতা করেন, কারণ কোসেম সুলতানের আশংকা ছিল সিংহাসনে বসলে ওসমান তার সন্তানদের হত্যা করবেন। কোসেম সুলতান প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ উন্মাদ মোস্তফাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন এবং সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথম উত্তরাধিকারী হিসেবে সুলতানের পুত্র নয় ভাই সিংহাসনে বসেন।

কথিত আছে সুলতান মোস্তফার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা এবং অনেকে তার মধ্যে একজন পবিত্র মানুষকে দেখেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যে এটা স্পষ্ট হয় যে সুলতান মোস্তফা শাসনকার্য পরিচালনায় অসমর্থ। তিনি তার প্রিয় দুইজন অল্পবয়সী পেয়াদাকে কায়রো এবং দামাস্কাসের গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং তার একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে পদচ্যুত করে একজন কৃষককে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যে কি না শিকারে সময় সুলতানকে পানীয় পানের আহবান করেছিল। বলা হয় তিনি তার উজিরদের পাগড়ি খুলে নিয়েছিলেন এবং তাদের দাড়ি টান দিয়েছিলেন।  মাত্র তিন মাস পরে খোজা বাহিনী দ্বারা মোস্তফা সিংহাসনচ্যুত হয়েছিলেন এবং আবারও কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল। তবে এবার সঙ্গী হিসেবে দুইজন দাসী দেওয়া হয়েছিল।

মোস্তফার পরে সিংহাসনে বসেছিলেন সুলতান প্রথম আহমেদের জেষ্ঠ্য সন্তান, ১৩ বছর বয়সী দ্বিতীয় ওসমান। কিশোর ওসমান তীর নিক্ষেপে বেশ পারদর্শী ছিলেন –  বিশেষ করে চলন্ত কোন লক্ষ্যে তীর নিক্ষেপে পটু ছিলেন। পোল্যান্ডে অভিযানের পূর্বে, ১৬২১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ওসমান তার ভাই মেহমেদের ফাসীর আদেশ দিয়েছিলেন। অল্প বয়সী হলেও, ওসমান খুব অল্প সময়ের মধ্যে উজির এবং মোস্তফার সমর্থকদের সরিয়ে দিয়ে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি তামাক ও মদ পান নিষিদ্ধ করেন এবং মাতাল সৈনিকদের দাস হিসেবে সমুদ্রে জাহাজে পাঠিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি সুলতানের বিশেষ বাহিনী জেনিচেরি সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি জেনিচেরিদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন, কারণ তার মতে পোলীয় অভিযান জেনিচেরি যোদ্ধারা খুব খারাপভাবে সম্পন্ন করে। ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে ওসমান, মক্কা অভিমুখে হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে শহর ত্যাগের ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেছিলেন। জেনিচেরিরা সন্দেহ করে তার মনে অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। কারণ তিনি তার সাথে করে তার ধন ও রত্ম নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ক্ষিপ্ত হয়ে জেনিচেরিরা অতর্কিত তারা প্রাসাদে অভিযান চালায় এবং ওসমানকে গ্রেফতার করে। সাত মিনার (ইয়েদিকুল) দুর্গের কারাগারে বন্দি করার আগে জেনিচেরিরা তাকে লোকজনের ভীড়ে একটি পঙ্গু ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তারা ওসমানকে হত্যা করার চেষ্টা করলে, বাগে আনার আগেই তিনি পাগলের মত নিজের সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করে ৬ আক্রমণকারীকে হত্যা করে। পরে জেনিচেরিরা তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। প্রকাশ্যে অপমান করতে তার কান কেটে নিয়ে তার মা, মাহফিরোজকে দেওয়া হয়েছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে “ভাই হত্যা” সাধারণ ব্যাপার হলেও, এটাই প্রথম রাজ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

সুলতান প্রথম মোস্তফা

এবারে মোস্তফা কারাগার ত্যাগ করতে, এমন কি দরজা খুলতে অস্বীকার করলো। জেনিচেরিরা একারণে কারাগারের ছাদে ফুটো তৈরী করেছিল। তারা দেখলো মোস্তফা তার দুই নারী সহচরের সাথে বসে আছেন, তারা দাবি করেন তখন তিনি “উন্মাদের মত হাসছিলেন”। তিনি শারীরিকভাবে দূর্বল ছিলেন, কারণ তিন দিন কেউ তাকে খাবার পরিবেশন করেনি। তাকে পানি দেওয়ার পরে, জেনিচেরিরা ভীত সুলতানকে পর্দার দড়ির সাহায্যে ছাদের ফুটো দিয়ে বের করা হয়েছিল। মোস্তফাকে দ্বিতীয়বারের মত সিংহাসনে বসানো হলেও, তিনি কার্যকরভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারেননি। তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে সিংহাসনচ্যুত করার সাথে জড়িত সকলকে তিনি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে উন্মাদ সুলতান মোস্তফা ভুলে গেলেন ওসমান মারা গেছেন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র ওসমানের খোঁজে প্রাসাদময় ছুটোছুটি করতে লাগলেন, দরজায় কড়া নাড়তে লাগলেন, তখন তিনি চিৎকার করে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের কাছে ক্ষমতার ভাড় থেকে নিজের মুক্তি চাইছিলেন। এরপরে একের পর এক উজিরে আজম দ্রুত বদল হতে থাকে। গাধার চালককে আয়া সফিয়া মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। সাম্রাজ্য জুড়ে রাজ্য শাসকরা সুলতানের নামে ইস্তাম্বুলে কর পরিশোধে অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে জেনিচেরিদের ভাতা পরিশোধে ব্যর্থ হলে, তারা বিদ্রোহ শুরু করেছিল। ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দের আগষ্ট মাসে যখন তিনি তার মরহুম ভাই আহমেদের অন্য সন্তানদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন তখন খোজা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে। মহান মুফতি ফতোয়া জারি করেছিলেন মানসিক বিকারগ্রস্ত কেউ সুলতানের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। মোস্তফা তার ভ্রাতুষ্পুত্র, চতুর্থ মুরাদকে সিংহাসন ছেড়ে দেন। মোস্তফা কারাগারে ফিরে যান এবং ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কারাগারেই ছিলেন।

লেখাটি আপনাদের ভাল লাগলে অবশ্যই  শেয়ার করবেন। Vusuku পেইজে লাইক দিয়ে অবশ্যই আমাদের সাথে থাকুন।

পাদটীকা

* কথিত আছে মোস্তফা অন্যান্য অটোমান সুলতান ও শাহজাদাদের মত ছিলেন, তিনি নারীদের পছন্দ করতেন না।

তথ্যসূত্র

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top