ইতিহাস

১১৭১ সন্তানের জনক মরোক্কোর ‘সূর্য রাজা’ সুলতান মাওলা ইসমাইল

সুলতান মাওলা ইসমাইল

অনেকে বলেন কিংবদন্তি, অনেকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন; কিন্তু এখন এই বিষয়ে সকল জল্পনার অবসান ঘটেছে, বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে মরক্কোর সুলতান মাওলা ইসমাইল ১০০০ এরও বেশি সন্তানের জনক এবং তা জৈবিকভাবে সম্ভব।

সুলতান মাওলা ইসমাইল একজন যোদ্ধা এবং বিশ্বের সবচেয়ে ফলবান পিতা হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৬৭২ থেকে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মরোক্কো শাসন করেন। কথিত ছিল যে তিনি ১০০০ এর বেশি সন্তানের জন্মদাতা ছিলেন। আপাত দৃষ্টিতে এটা অসম্ভব মনে হলেও, বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এসেছে যে এটা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, যদি এই শাসক দিনে অন্তত একবার যৌনসম্পর্ক করেন টানা ৩২ বছর।

কিভাবে মাওলা ইসমাইল ১০০০ এর বেশি সন্তানের জনক হতে পারেন?

Moulay Ismail

ফরাসি কূটনীতিক ডমিনিক বুশনোট তার গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেছেন ১,১৭১ জন সন্তানসন্ততি। এর পূর্বে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলেছিল মরোক্কোর সুলতানের ৮৮০ জন সন্তান ছিল। সে যাই হোক, সুলতান মাওলা ইসমাইল ই হলেন ‘ইতিহাসে সর্বকালে যাচাই করা সম্ভব এমন কোন ব্যক্তি যিনি সর্বোচ্চ সংখ্যক সন্তানের অধিকারি’ খেতাবপ্রাপ্ত।

বিজ্ঞানীরা পূর্বে তার এই সন্তানসন্ততির সংখ্যাকে অসম্ভব বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই বলে যে নারীরা প্রতি মাসে কেবল কিছু দিন সন্তান ধারণে সক্ষম থাকেন।

লাইভ সাইন্স এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিম্যুলেশন তৈরী করে বের করার চেষ্টা করেছেন, ৩২ বছর সময়ে ১,১৭১ জন সন্তানের পিতা হতে সুলতান মাওলাকে ঠিক কতবার যৌনসম্পর্ক করতে হয়েছিল।

গবেষণায় পাওয়া যায়, “রক্তপিপাসু” বলে পরিচিত এই শাসক তার ১,১৭১ জন সন্তানের জৈবিক পিতা হতে পারেন, যদি তিনি দৈনিক ০.৮৩ থেকে ১.৪৩ বার যৌনসম্পর্ক করেন; আর তার ৫৬ বছর বয়সকাল পর্যন্ত ৩২ বছরে প্রত্যেক দিন যৌনসম্পর্ক করলে তাকে গড়ে অন্তত দৈনিক একবার যৌনসম্পর্ক করতে হয়েছিল।

কিভাবে এত সংখ্যক সন্তান ধারণের জন্য পর্যাপ্ত মা পেলেন? সহজ ব্যাপার! জানা যায় সুলতানের ৪ জন স্ত্রী এবং ৫০০ উপস্ত্রী বা দাসী ছিল। গবেষণায় দেখা যায় ১০০০ শিশু জন্ম দিতে মাত্র ৬৫ থেকে ১১০ জন নারী প্রয়োজন।

ক্ষমতাধর, নিষ্ঠুর ও কামোদ সুলতান মাওলা ইসমাইল

ক্ষমতা ও ভয়ানক শাসক পেছনে, মাওলা ইসমাইল একজন মাঝারি আকারের, সুদর্শন ব্যাক্তি ছিলেন। যাকে সবসময় সাদা ও সবুজ পোষাকে দেখা গেছে। তবে যখন তিনি রাগান্বিত অবস্থায় তিনি হলুদ পোষাক পরতেন। এক কথায় তিনি বেশ সহজাত দক্ষতা সম্পন্ন ছিলেন।

তিনি চমৎকার একজন ঘোড়সওয়ার ছিলেন, তিনি কোরআনকে এতটাই ভালবাসতেন আর মূল্য দিতেন যে ঘোড়ায় সওয়ার করা অবস্থাতেও তার সাথে ক্রীতদাস থাকতো তাদের কাজ ছিল কোরআনকে সুলতানের সামনে রাখা যেন তিনি কোরআন পড়তে পারেন।

নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বংশধর হিসেবে, নির্দয় বা সদয় তার যেকোন কর্মকাণ্ড, আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) এর আদেশ বলে বিবেচনা করা হত। তার উপস্থিতিতে যেকেউ মাথা নত, চোখ মাটির দিকে রাখতে হত, এবং সুলতানের চোখে তাকানো নিষিদ্ধ ছিল।

এই সর্বাধিনায়ক রাজকীয় অভিষেকের মাধ্যমে সিংহাসন বসলেও, সাথে উত্তরাধিকারসূত্রে পান এমন একটি দূর্বল রাষ্ট্র যেখানে বংশ-পরম্পরায় চলেছে অভ্যন্তরীণ জাতিগুলোর গোষ্ঠীগত যুদ্ধ। তবে তিনি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তার রাজ্যকে একত্রিত রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

Mausoleum-Moulay-Ismail-2-CTH

মাওলা ইসমাইলের দরগার ভেতরে ফোয়ারা। মেকনেস, মরোক্কো।

কোন জাতি গোষ্ঠী মাওলা ইসমাইলের কাছে আত্মসমর্পন করলে, গোষ্ঠীর নেতা তার সবচেয়ে মার্জিত এবং সুন্দরী কন্যাকে সুলতানের উপহার হিসেবে প্রদান করতেন, যা তার অপরিসীম ক্রমবর্ধমান হারেমে যুক্ত হত। মাওলা ইসমাইলের শাসনামলে রাজকীয় হারেমের ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল।

যদি দুর্ভাগ্যক্রমে কেউ তার হারেমের কোন নারীর উপর নজর দিয়ে ফেলে, এই কারণই যথেষ্ট ছিল তার মৃত্যদণ্ডের জন্যে। কথিত আছে, সুলতানের হারেমে নজর দেওয়ার অভিযোগ এড়াতে, পুরুষরা সব সময় সুলতানের নারীদের সামনে মাটির দিকে মাথা নত করে থাকত।

তিনি ৪ জন নারীকে বিয়ে করে এবং তার ৫০০ এরও বেশি উপস্ত্রী বা দাসী ছিল। ব্যাভিচারের সন্দেহে নারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। মাওলা ইসমাইল অবিশ্বস্ত নারীদের শিরচ্ছেদ করে, স্তন কেটে এবং দাঁত তুলে নিয়ে শাস্তি দিতেন। এই মৃত্যুভয় তার হারেমে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একটি কৌশল বলে অনেকে মনে করেন কারণ একজন পুরুষ হয়ে ৫০৪ জন্য নারীকে দেখে রাখা সম্ভব ছিল না।

মাওলা ইসমাইল “বর্বর” বলে পরিচিত না হলেও, তার রাজত্বে অর্ধ শতাব্দী সময়ে তিনি ৩০,০০০ এরও বেশি মানুষ হত্যা করেছেন। এভাবেই তিনি “রক্তপিপাসু” নামে পরিচিত হতে থাকেন। তিনি তার বিরোধীদের ভয় দেখাতে একবার তিনি পুরো শহরের দেয়ালকে শত্রুদের ১০,০০০ কাটা মাথা দিয়ে সজ্জিত করার আদেশ দেন।

এই “বীর সুলতান” ১,১৭১ জন শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে একজন পুরুষের সর্বোচ্চ সংখ্যক সন্তানসন্ততি লাভের রেকর্ড। তিনি তার বৈধ সন্তানদেরকে বাকি সন্তানদের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন।

সুলতান মাওলা ইসমাইল

সুলতান মাওলা ইসমাইলের ছবি সম্বলিত মরোক্কোর ডাকটিকিট।

নারীদের প্রতি আসক্ত এমন কুখ্যাতি ছাপিয়ে, মাওলা ইসমাইল ছিলেন একজন অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যাক্তি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা বিরোধিতা তিনি একদম পছন্দ করতেন না। তিনি তার এই স্বৈরাচারী মনোভাব যুদ্ধকালীন সময়ে এবং দৈনন্দিন জীবনেও অনুশীলন করতেন।

গোপন ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, যে সকল দাস তাকে ঘোড়ায় চড়তে সাহায্য করতো, কোন কারণ ছাড়াই তিনি তাদের শিরচ্ছেদ করতেন। এমন কি তিনি তার নিজের সন্তানকেও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার দায়ে বাম হাত ও ডান পা কেটে দিয়েছিলেন। অনেকে বিশ্বাস করেন, তার এই নিষ্ঠুরতা ১৭ শতকের একজন সুলতানের জন্য একটি অপরিহার্য কৌশল ছিল।

এই সুলতান সম্পর্কে আরেকটি বিষয় যা কম পরিচিত তা হল তিনি বিড়াল খুব ভালবাসতেন। তার ৪০টিরও বিড়াল ছিল, এবং তিনি তাদের নাম দিয়েছিলেন। তিনি বিড়ালদের টাটকা মাংস খেতে দিতেন এবং তার পছন্দের বিড়ালের সাথে খেলাধুলায় যথেষ্ঠ পরিমাণে সময় দিতেন।

এ সত্বেও, বিড়ালরাও তার রক্তপিপাসু প্রকৃতি থেকে পালাতে পারেনি। তার এক বিড়াল তাকে অসন্তুষ্ট করেছিল, সুলতান তার দাস-দাসীদের রাস্তায় রাস্তায় পাঠান জনসাধারণের এই খবর দিতে যে একটি বিড়ালকে জনসম্মুখে নির্যাতনের পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। “ঝিকে মেরে অন্যকে বোঝানোর মত”, সুলতান তার পশুদের ব্যবহার করতেন সকলকে তার ক্ষমতা বোঝাতে যে, কেউ তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারবে না, এমন কি তার পৌষ্যরাও নয়।

বীর যোদ্ধা সুলতান মাওলা ইসমাইল

তার এই ভয়ঙ্কর রূপ সত্ত্বেও, তাকে মরোক্কোর ইতিহাসে সবচেয়ে মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ১,৫০,০০০ এরও বেশি সদস্যের সাব-সাহারান আফ্রিকার কালো পুরুষদের এক সুসজ্জিত বাহিনী “ব্ল্যাক গার্ড” তার সেবা নিয়োজিত ছিল।

তার শাসনামলে, মাওলা ইসমাইল মরোক্কোর রাজধানী ফেজ থেকে মেকনেস সরিয়ে নেন। তিনি মেকনেসে বেশ কয়েকটি গেট,  মসজিদ, বাগান, কোরআন স্কুল নির্মাণসহ বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি বহুবার অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তুর্কীদের মরোক্কোর ভূখণ্ডে ঢুকতে বাঁধা দিয়েছেন। তিনি রাজ্যের বিভিন্ন সমুদ্র বন্দরে ইউরোপীয় বিজয়ীদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি মাহদিয়া শহরের উপর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। মাওলা ইসমাইল ইংরেজদের হটিয়ে পুনরায় টেনজিয়ার বিজয় করেন এবং স্প্যানীয়দের কাছ থেকে লারাচকে পুনরায় ছিনিয়ে নেন।

সুলতান মাওলা ইসমাইল এবং ফান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের খুব গভীর বন্ধুত্ব ছিল। ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে, সুলতান মোহাম্মদ তামিমকে তার রাষ্ট্রদূত হিসেবে ফ্রান্সে পাঠান। এমন কি তিনি ফরাসি রাজকুমারী ম্যারি অ্যান দে বারবোনকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান, কিন্তু রাজকুমারী তা প্রত্যাখান করেন।

মাওলা ইসমাইলের মৃত্যুর সময়, তার রাজকীয় বাহিনী “ব্ল্যাক গার্ড” মরোক্কোর ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহৎ বাহিনীতে পরিনত হয়েছিল।

Mulai Ismail tomb (js)

মাওলা ইসমাইলের সমাধি, মেকনেস, মরোক্কো।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top