ইতিহাস

রেনইন প্লট: সুন্দরীদের গোপন ষড়যন্ত্র

রেনইন প্লট: সুন্দরীদের গোপন ষড়যন্ত্র

১৬ শতকে চীনের মিং রাজবংশের এক শাসক ছিলেন সম্রাট জিয়াংজিং। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নিষ্ঠুর এবং নারীলোভী। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক সময় তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। হারেমের সুন্দরীদের সম্রাটকে হত্যা চেষ্টার এই ঘটনাকে ইতিহাসে “রেনইন প্লট” বলা হয়ে থাকে। আততায়ীরা তাদের মিশনে প্রায় সফলতা পেলেও, শেষ পর্যন্ত সম্রাট সুরক্ষিত ও নিরাপদে ছিলেন।

এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাট

চীনা ইতিহাস জুড়ে, সম্রাট হত্যাকাণ্ড বা হত্যার চেষ্টার অনাহুত ঘটনা নয়, তবে জিয়াজিং সম্রাটের হত্যাচেষ্টার ঘটনা এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে, ঝু হওকং তার চাচাত ভাই, সম্রাট ঝেগডে এর পরে মিং রাজবংশের ১২তম সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসেন। ঝু হওকং রাজকীয় নাম ‘জিয়াজিং’ গ্রহণ করেন, যার অর্থ হল “প্রশংসনীয় প্রশান্তি”, কিন্তু বাস্তবে তিনি এর ধারের কাছেও ছিলেন না।

রাজত্বের শুরুতে, জিয়াজিং সম্রাটকে কঠোর ও উচ্চাভিলাষী শাসক হিসেবে মনে করা হত। তার শাসনামলে তার সিদ্ধান্তের প্রাধান্য দেখা যায়, যেমন, দরবারে বিরোধিতা সত্যও, তিনি তার পিতা-মাতার (যারা চীনা সিংহাসনে ছিলেন না) আচারানুষ্ঠানের মান মর্যাদা ও শিরোনাম গ্রহণে দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করেন, যা কেবল কোন রাজকীয় বংশের জন্য প্রযোজ্য ছিল।

明世宗像

সম্রাট জিয়াজিং এর প্রতিকৃতি।

এই পদক্ষেপে যেমন সম্রাটের “দৃঢ় ইচ্ছা” মনোভাবের প্রকাশ ঘটে, তেমনি সম্রাটের ধর্মানুরাগী চরিত্রেরও প্রকাশ ঘটে, তবে এ ঘটনায় একটি অন্ধকার দিকও উন্মোচিত হয়। সম্রাটের দৃঢ় ইচ্ছা প্রেক্ষিতে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে দরবার সম্রাটের দাবি মেনে নেয়, যদিও পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসেই এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তারা সম্রাটকে তার পরিবারের রাজকীয় মর্যাদা বাতিল করতে বাধ্য করে। চূড়ান্তভাবে সম্রাট ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে তার পরিবারের রাজকীয় মর্যাদা পুনস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, এতে দরবারের শত শত কর্মকর্তা কর্মচারী সম্রাটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। জিয়াজিং বেশ কিছু বিদ্রোহীকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন, অনেককে পিটিয়ে হত্যা করেছিলেন। বাকিদের পদচ্যুত করা হয়েছিল।

বিদ্রোহীদের দমনে সম্রাটের এই আচরণ হয়তো চীনের অন্যান্য সম্রাটের চেয়ে নমনীয় মনে হতে পারে, তবে এটা ছিল কেবল শুরু এবং পরবর্তীতে তার নিষ্ঠুরতার জন্য জিয়াজিংকে নিষ্ঠুর সম্রাট হিসেবে স্মরণ করা হয়।

জিয়াজিং তাওইজম অনুশীলন করতেন বিশেষ করে আলকেমির ভক্ত ছিলেন। সম্রাট জিয়াজিং অমরত্ব লাভের আশায় অমৃতের খোঁজে ছিলেন। জিয়াজিং এর নিষ্ঠুরত, অনেকের মতে অনন্ত জীবন লাভে তার অনুসন্ধানই, রেনিইন প্লট বা ষড়যন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল।

সম্রাট জিয়াজিং তার রাষ্ট্রীয় বজরায়।

ভুসুকুতে আরও পড়ুন, মাও সেতুং এর শাসনামলে চীনের অদ্ভুত কিছু ঘটনা।

রেনিইন ষড়যন্ত্র

রেনিইন ষড়যন্ত্র ঘটেছিল ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে, এ ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল সম্রাটের হেরেমের ১৬ জন নারী যারা সম্রাটের জীবন নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই ঘটনার নামকরণ করা হয়েছে রেনিইন বছরের নামানুসারে, যা বছর গণনায় চীনা এবং অন্যান্য পূর্ব এশীয় সভ্যতায় ব্যবহৃত ৬০ বছরের একটি চক্রের ৩৯ তম বছর। অনেকের মতে, সম্রাট অমরত্ব পেতে সম্রাট এক ধরনের ‘লাল বড়ি’ সেবন করতেন, যা তৈরী করতে সংগ্রহ করা হত কুমারী নারীদের রজঃস্রাব।

সম্রাটের উপস্ত্রী/দাসী

সম্রাটের এই জঘন্য চাহিদা মেটাতে ১৩-১৪ বছর বয়সী বহু নারীদের হারেমে রাখা হত, যাদের কেবলমাত্র মালবেরি বা তুন্তগাছের পাতা আর বৃষ্টির পানি খেতে দেওয়া হত। সম্রাট মনে করতেন এ উপায়ে তার বড়ির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান বিশুদ্ধ থাকে। এই সব অল্প বয়সী নারীদের অত্যাচার ও নির্যাতন করা হত এবং এরা অনাহারে থাকতো; কেউ অসুস্থ হয়ে পরলে তাকে আলাদা রাখা হত। সম্রাটের সব যৌন কামনা ও চাহিদা মেটাতে হেরেমের নারীদের সহজেই রাজী করতে তাদের উপরেও নির্যাতন করা হত। অত্যাচারের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে নারীরা একত্র হয়ে এই বর্বর শাসককে হত্যার পরিকল্পনা করা আশ্চর্যজনক ছিল না।

孝靜毅皇后

সম্রাজ্ঞী ফ্যাং এর প্রতিকৃতি।

এক রাতে সম্রাট তার প্রিয় দাসীর কক্ষে তার প্রিয় দাসী ডুয়ান (লেডি চাও নামে পরিচিত) এর সাথে রাত কাটাচ্ছিলেন, হেরেমের ১৬ নারী সম্রাটকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমে পরেছিল। দাসী ও তার সেবকদের কাজ শেষ হলে, সম্রাট সেখানে একা অবস্থান করেন। এই সুযোগে হেরেমের নারীরা সম্রাটকে আক্রমণ করে। অন্যরা সম্রাটকে ধরে রাখলে, চুলের ফিতা খুলে এক দাসী সম্রাটের গলায় ফাঁস দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু এতে ব্যর্থ হলে তারা পর্দার দড়ি দিয়ে সম্রাটের গলা বাধেঁ, কিন্তু ভুলভাবে বাঁধার কারণে গিট শক্ত না হওয়ায় তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল।

পরবর্তী প্রভাব

ষড়যন্ত্রকারীদের একজন ভয় পেয়ে এই গুপ্তহত্যার চেষ্টার খবর সম্রাজ্ঞী ফ্যাং এর কাছে ফাঁস করে দেয়। ঘটনার পরে সম্রাট বেশ কয়েকদিন অচেতন অবস্থায় থাকলে, সম্রাজ্ঞী বিষয়টি নিজের হাতে সামাল দেন। তিনি অভিযুক্ত হেরেমের নারীদের জীবিত অবস্থায় টুকরো টুকরো করে ধীরে ধীরে মারা আদেশ দেন। এই সকল নারীদের পরিবারের সদস্যদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দাসী ডুয়ানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে পরে জানা যায় এই দাসী এই ষড়যন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না, তবে যেহেতু এই ঘটনা দাসীর কক্ষে ঘটেছিল তাই প্রাসাদে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরাতে সম্রাজ্ঞী এই অযুহাতে দাসীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।

চীনা সম্রাটদের ৫০০ বছরেরও বেশি সময়ের বাসস্থান এই প্রাসাদ “নিষিদ্ধ নগরী”। Photos:dreamofacity.com

জিয়াজিং এর জীবনে এই ঘটনার পরে, সম্রাট নিজেকে নিষিদ্ধ নগরীর পশ্চিম অংশে সরিয়ে নেন, যেখানে তিনি বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন শুরু করেন এবং তার রাজত্বের পরবর্তী দুই দশক দরবার থেকে বিরত থাকেন। জিয়াজিং এর দীর্ঘকালীন রাজত্বকাল মিং রাজবংশে কিছুটা স্থিতি আনলেও, রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা হ্রাস ও অনিহা রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে যায়। সম্রাট জিয়াজিং ৫৯ বছর বয়সে ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। ধারণা করা হয় অমরত্বলাভের আশায় তিনি যেই অমোঘ ঔষধ সেবন করেছেন জীবনভর তাতে থাকা বিষাক্ত পারদের কারনেই তিনি মারা যান।

তথ্যসূত্র

  • Hultengren, I., 2017. Zhu Houcong – the Jiajing Emperor. [Online]
    Available at: http://www.mingtombs.eu/emp/11jiajing/jiajing.html
  • Lin, Y., 2014. Fang, Empress of the Jiajing Emperor, Shizong, of Ming. In: L. X. H. Lee & S. Wiles, eds. Biographical Dictionary of Chinese Women, Volume II: Tang Through Ming 618 – 1644. Hong Kong: University of Hong Kong Libraries Publications, pp. 59-61.
  • McMahon, K., 2016. Celestial Women: Imperial Wives and Concubines in China from Song to Qing. London: Rowman & Littlefield.
  • The Editors of Encyclopædia Britannica, 2008. Jiajing. [Online]
    Available at: https://www.britannica.com/biography/Jiajing
  • Theobald, U., 2014. Persons in Chinese History – Ming Shizong 明世宗, the Jiajing Emperor 嘉靖. [Online]
    Available at: http://www.chinaknowledge.de/History/Ming/personsmingshizong.html
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top