ইতিহাস

প্রাচীন মিশরের মমি ‘র ৯টি অদ্ভুত ব্যবহার, জানলে অবাক হবেন

মিশরের মমি

মিশরের মমি দেখেছেন কখনো? আসল মমি দেখেছেন হয়তো কোন যাদুঘরে; আর কাল্পনিক মমি অবশ্যই দেখেছেন কোন চলচ্চিত্রে বা গল্পে। কিন্তু বিগত শতাব্দীগুলোয় মমি বিভিন্ন উদ্ভাবনী এবং অদ্ভুত কাজে ব্যবহার করা হতো; শৈল্পিক বা বাণিজ্যিক, বিজ্ঞানে কিংবা বিনোদনে, এমন কি কাগজের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

Félix Bonfils - Mumienhändler

ক্লান্ত মমি বিক্রেতা এবং তার মমি (Creative Commons)

১৭৯৮ সালে নোপলিয়ন মিশর আক্রমণ করলে এবং বেশ কিছু পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ফলে ১৯ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে মিশরের মমির আজব সব ব্যবহার শুরু হয়। ১৮৩০ এর দিকে গুপ্তধনের খোঁজে বিত্তবান পশ্চিমা ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের ঢল ছোটে মিশরের মরুভূমিগুলোতে। যদি কেউ মমি খুঁজে পেতেন, সেটা ছিল তার জন্য অত্যন্ত গর্বের, এবং এ ঘটনাকে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন বলে মনে করা হতো। ইউরোপীয়দের মমি উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, কেউ মিশর থেকে ইউরোপে ফিরে যদি এক হাতে মমি আর অন্য হাতে কুমীর দেখাতে না পারতেন, তাহলে তাকে কেউ পাত্তাই দিতো না।

আসুন জানা যাক ১৯ শতকে ইউরোপীয়রা কিভাবে মিশরের মমির ব্যবহার বা অপব্যবহার করতো,

রোগের ঔষধ হিসেবে মমির ব্যবহার

Albarello MUMIA 18Jh

১৯ শতকের মাম্মিয়া পাত্র, জার্মানী (Creative Commons)

অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ১৯ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয়রা সুস্বাস্থ্যের জন্য একধরনের ক্যানিবলিজম অনুশীলন করতো। ঐতিহাসিক রিচার্ড সুগের মতে, ১৯ শতকের শেষের দিকে, থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে মানব শরীরের ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা ছিল। বেশিরভাগ জনপ্রিয় চিকিৎসায় মানব দেহের রক্ত, মাংস, হাড় এমন কি মাথার খুলিও ব্যবহার করা হত।

মমি, প্রায়ই “মামিয়া” (বিটুমিন আর মমির সংমিশ্রণে এক বিভ্রান্তিকর শব্দ) হিসেবে বিক্রি করা হত, এটি ত্বকে ব্যবহার করা হত, অথবা গুড়ো করে পানীয়তে মিশিয়ে ত্বকের কালশিটে দাগসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অনেকে মনে করতো মমিতে আরোগ্য করার বিশেষ ক্ষমতা আছে। অনেকের মতে মমিতে রক্ত চলাচল বাড়াতে বিশেষ গুণ রয়েছে। ব্যবসা হিসেবে মুম্মিয়া এমন লাভজনক আকার ধারণ করলে যে চাহিদা মেটাতে দন্ডপ্রাপ্ত আসামী, দাস, ভিক্ষু এমন কি ঊটের লাশ থেকেও নকল মমি তৈরি করা শুরু হয়েছিল, এখনকার বাজারে ঔষুধ নকল করার মত।

যা আবিষ্কার না হলে হয়ত প্রাচীন মিশরের ইতিহাস অজানাই থেকে যেত, কি সেই বস্তু জানতে পড়ুন, রোসেটা স্টোন: প্রাচীন মিশর আর ফেরাউন রহস্যের চাবি

পার্টির জৌলুশ বাড়ায় মিশরের মমি

Mummy Unrapping

(education.blurtit.com)

কোন পার্টি বা গেট-টুগেদারের জন্য একটা থীম দরকার? ভিক্টোরিয়ান আমলের কোন রহস্য উন্মোচন হতে পারে বা পার্টিতে কোন মমি খোলা হতে পারে। ব্যপারটা এমন যে আপনার ড্রইং রুমে তুতেনখামুনের মমি রহস্য উন্মোচন করা হচ্ছে, পার্টিতে সবার মধ্যে এক শিহরণ খেলে যাচ্ছে। পার্টির জৌলুস বাড়াতে এমন ধরনের থীমের ব্যবহার তখনকার দিনের ইংরেজ জীবনে নতুন কোন ব্যপার ছিল না, বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে একটু পন্ডিত মনে করতেন।

চিত্রকরের রঙে মমি থেকে তৈরি রঞ্জক হিসেবে

Martin Drolling - Interior of a Kitchen (detail) - WGA6679

মার্টিন ড্রোলিং – ইন্টেরিয়র অফ আ কিচেন; ছবিতে মমি ব্রাউনের ব্যবহার করা হয়েছে (Creative Commons)

১৭ শতকের শুরুর দিকে, মমি ব্রাউন নামে এক ধরনের রঞ্জক পাওয়া যেত। মমি থেকে তৈরি এই রঞ্জক তখনকার ইউরোপীয় শিল্পীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। চিত্রশিল্পী দ্যলাক্রোয়া এটি ব্যবহার করতেন, বৃটিশ শিল্পী স্যার উইলিয়াম বিচে ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে প্রাক-রাফায়েলীয়দের কাছে এর বেশি পছন্দের ছিল। মমি ব্রাউন তৈরি হতো মমির মাংস থেকে। তবে বেশির ভাগ লোকে অজান্তেই ব্যবহার করতো। কি দিয়ে তারা আকঁছে তা তারা জানতোই না।

ঘর সাজাতে স্মারক হিসেবে মিশরের মমি

১৯ শতকের বিত্তবান শ্রেনীর মধ্যে মিশর যাত্রা এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে অনেকে বাড়ীতেই ড্রইং রুমে স্মারক হিসেবে মমি রাখা হতো, এমন কি অনেক সময় বেডরুমেও মমি রাখতো। অনেকে বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মমির হাত, পা বা মাথার প্রদর্শনী করতো। বিশেষ করে বাড়ীর মেনটালপিছের উপরে কাঁচের ডোমের উপর সেগুলো দেখা যেত। অনেক সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও মমি প্রদর্শীত হতো। সিকগোর একটি ক্যান্ডি শপে ১৮৮৬ সালে একটি মিশরীয় মমি প্রদর্শন করে ক্রেতা আকৃষ্ট করা হতো। বলা হতো মমিটি ফেরাউনের মেয়ে মমি যিনি মূসাকে নলখাগরার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল।

কাগজ হিসেবে মমির ব্যবহার

যারা কাগজ তৈরির ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণা করেন তাদের কাছে এটা একটি বিতর্কিত বিষয়। অনেক গবেষকের মতে, ১৯ শতকের মধ্যভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে কাগজের মিলগুলো মমি মোড়ানো কাপড়গুলো কাঁচামাল হিসেবে আমদানী করতো। অনেকের মতে ১৯ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকায় মুদ্রিত জিনিষের বেশ ভাল চাহিদা দেখা যায়। গাছের পাল্পে কাগজ তৈরি শুরু হয় ১৮৫০ সালে যখন মমি কাগজের সল্পতা দেখা যায়। যদিও অনেকের মতে মমির সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাই এ গল্পটি নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে।

মঞ্চে ভীতির আবহ তৈরিতে প্রপ হিসেবে মমি

সাহিত্য এবং হরোর সিনেমাতে মমিগুলো রোমান্টিক ভূত হিসেবে বেশ পরিচিত। কিন্তু যাদুর মঞ্চে এখন আর মমি দেখা যায় না। এখনকার মতই ভয়ঙ্কর আর উদ্ভট একটা অনুভূতি দিতে তখন যাদুর মঞ্চে প্রপ হিসেবে মমি ব্যবহার করা হতো। তা সে আসল বা নকল মমিই হোক না কেন।

সার তৈরিতে মিশরের মমি

British museum, Egypt mummies of animals (4423733728)

বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত মিশরীয় বেড়াল মমি (Creative Commons)

দেব-দেবীদের প্রসন্ন লাভে লক্ষ লক্ষ জীবজন্তু প্রাচীন মিশরে মমি করা হয়েছিল। বিশেষ করে বিড়ালের মমির পরিমান এতো ছিল যে ১৯ শতকের শেষের দিকে ইংরেজ কোম্পানিগুলো কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য মিশর থেকে এগুলো কিনে নেয়। একটি হিসেবে পাওয়া গেছে একটি কোম্পানী প্রায় ১৮,০০০ বিড়ালের মমি কিনেছিল যার ওজন প্রায় ১৯ টন হবে। এগুলো দিয়ে সার তৈরী করা হয়েছিল এবং সাড়া ইংল্যান্ডে জমিতে তা ব্যবহার করা হয়েছিল। এই চালানের একটি বিড়াল খুলি এখনও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ন্যাচারাল হিস্টরি ডিপার্টমেন্টে রক্ষিত আছে।

খ্যাতিমানদের ধ্বংসাবশেষের নকল হিসেবে মমির ব্যবহার

১৪৪৩ সালে জোয়ান অফ আর্ককে পুরিয়ে মারার পরে তার হত্যাকারীরা মনস্থির করে তার কোন চিহ্ন পৃথিবীতে রাখবে না। তাকে দ্বিতীয়বার পোড়ানো হয়েছিল এবং ধ্বংসাবশেষ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু ১৮৬৭ সালে একটি পাত্র আবিষ্কৃত হয়, যাতে জোয়ান অব আর্কের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হত। চার্চ পাত্রটিকে আসল বলে ঘোষণা দিয়েছিল, পরবর্তীতে তা একটি জাদুঘরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ২০০৭ এ ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা এটা পরীক্ষা করে দেখেন এর মধ্যে যা রয়েছে তা জোয়ানের প্রায় হাজার বছর আগেকার কোন বস্তু। এগুলোর মধ্যে আছে মানব পাঁজর ও বেড়ালের অস্থিমজ্জা, যা প্রাচীন মিশরীয় মমির অংশ।

তহবিল গঠনে মমির পদর্শনী

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালে রক্ষিত পেডিহারসেফ মমি (massgeneral.org)

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল প্রথম স্থান যেখানে আধুনিক অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহারে প্রথম পাবলিক সার্জারি করা হয়েছিল, ১৮৪৬ সালে এই স্থানটি ইথার ডোম নামে একটি এম্পিথিয়েটার ছিল। কিন্তু এছাড়াও এ স্থানে আরেকজনের বসবাস ছিল যা কোন হসপিটালে থাকে না, তা হল একটি মিশরের মমি।

১৮২৩ সালে মমিটি ম্যাসাচুসেটস জেনারেলে উপহার হিসেবে আসে সিটি অব বোস্টন পক্ষ থেকে। ১৯ শতকের শুরু দিকে মমিটি মূলত কিনে আনেন একজন ডাচ ব্যবসায়ী, তিনি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে এটা দেন হসপিটালের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে। হসপিটালের মতে, মমিটি দেখতে শত শত লোক জড়ো হয়েছিল, প্রত্যেকে  তখন ০.২৫ ডলারের বিনিময়ে দেখেছিল আমেরিকায় প্রথম মানুষের সম্পূর্ণ মিশরীয় মমি। এরপরে বহুবার বহুস্থানে প্রদর্শনী করে হসপিটালের জন্য তহবিল সংগ্রহে ব্যবহার করা হয়েছে । মমিটি আজও সেই হসপিটালে অবস্থান করছে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top