ইতিহাস

রোসেটা স্টোন: প্রাচীন মিশর আর ফেরাউন রহস্যের চাবি

রোসেটা স্টোন

রোসেটা স্টোন সম্পর্কে আপনি সম্ভবত শুনেছেন। এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সবচেয়ে বিখ্যাত বস্তুর মধ্যে একটি, কিন্তু আসলে এটি কি? আসুন বিস্তারিত জেনে নেই…

আসলে কি এই রোসেটা স্টোন?

এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সবচেয়ে বিখ্যাত বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু কি এই রোসেটা স্টোন?

রোসেটা স্টোন

১৭৯৯সালে পাওয়া রোসেটা স্টোনের ভগ্নাবশেষ এবং শিল্পী থর্নের কল্পনায় “মূল ফলকটি দেখতে যেমন ছিলো”।

রোসেটা স্টোন হল একটি বড় পাথর ফলক বা শিলালিপির ভাঙা অংশ। এতে কিছু বার্তা খোদাই করে লেখা আছে, হায়ারোগ্লিফিক, ডেমোটিক এবং গ্রিক – এই তিন ধরনের লিপি (স্ক্রিপ্ট) রয়েছে। যে কারণে এই রোসেটা স্টোন গুরুত্বপূর্ণ তা হল, মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ (লেখার পদ্ধতি হিসেবে ছবির ব্যবহার) পাঠোদ্ধার বা পড়তে শিখতে শিলালিপির এই ভাঙা অংশ বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লু বা সূত্র ছিল।

কেন এই রোসেটা স্টোন গুরুত্বপূর্ণ?

এই শিলালিপিতে লেখা রয়েছে রাজা (পঞ্চম টলেমী, ২০৪-১৮১ খ্রিষ্টপূর্ব) সম্পর্কে একটি সরকারী বার্তা, যাকে বলা হয় ডিক্রি বা ফরমান। এই ফরমান বড় বড় পাথরের ফলকে খোদাই করে অনুলিপি করা হত, এদের বলা হত স্টালি। এই স্টালি মিশরের প্রত্যেকটি মন্দির বা উপাসনালয়ে বসিয়ে ফরমান জারি করা হত। কোন মন্দিরে এই ফলক জানান দিত যে মেমফিস (মিশরে) এ মন্দিরের ধর্মযাজক বা পুরোহিতগণ এই রাজাকে সমর্থন করেন। রোসেটা স্টোন এমন ধরনের একটি অনুলিপি, যার আসলে নিজের তেমন গুরুত্ব নেই।

মিশরের আরেক আইকনিক বস্তু মমি’র অবাক করা সব ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পড়ুন, প্রাচীন মিশরের মমি ‘র ৯টি অদ্ভুত ব্যবহার, জানলে অবাক হবেন

আমাদের জন্য যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ এই ফরমানটি ৩ টি লিপিতে লেখা হয়েছিল, হায়ারোগ্লিফ (যাজকদের জন্য উপযুক্ত ফরমান), ডেমোটিক (মিশরীয়দের নিজস্ব স্ক্রিন্ট যা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হত, যাকে বলা হত ‘জনগণের ভাষা’), এবং প্রাচীন গ্রিক (প্রশাসনিক ভাষা – মহান অ্যালেকজান্ডারের বিজয়ের পরে মিশর শাসন করে গ্রিক-মেসিডোনীয় শাসকগণ)।

রোসেটা স্টোনটি পাওয়া গিয়েছিল ভাঙা এবং অসম্পূর্ণ অবস্থায়। এতে হায়ারোগ্লিফিক লিপির ১৪টি লাইন ছিল:

রোসেটা স্টোন

একটি কারতুচ সহ বিস্তারিত হায়ারোগ্লিফ রয়েছে যেখানে টলেমির নাম (ডান থেকে বামে) রয়েছে।

ডেনোমিক লিপির ৩২ লাইন:

রোসেটা স্টোন

লেখার ডোমেনিক অনুচ্ছেদের বিস্তারিত।

এবং প্রাচীন গ্রিক লিপির ৫৩ লাইন:

রোসেটা স্টোন

প্রাচীন গ্রিক অনুচ্ছেদের বিস্তারিত। আপনি টলেমির নামটি ΠΤΟΛΕΜΑΙΟΣ এর সাথে মিলিয়ে খুঁজে নিতে পারেন।

মিশরীয় পুরাতত্ত্বে রোসেটা স্টোনের গুরুত্ব অপরিসীম। যখন এটা আবিষ্কৃত হয়, তখন কেউ জানতো না কিভাবে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ পড়তে হয়। যেহেতু লেখাগুলোতে একই জিনিষ ভিন্ন তিনটি লিপিতে লেখা হয়েছে, এবং গবেষকগণ প্রাচীন গ্রিক পড়তে জানতেন, তাই রোসেটা স্টোন হায়ারোগ্লিফ পাঠোদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রে পরিনত হয়।

কখন, কিভাবে রোসেটা স্টোন পাওয়া গেছে?

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৭৯৮ থেকে ১৮০১ সাল পর্যন্ত মিশরে অভিযান চালান, যার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আধিপত্য বিস্তার এবং ভারতের উপর ব্রিটিশদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে হুমকি প্রদান। যদিও ১৭৯৯ সালের জুলাই মাসে এই স্টোন আবিষ্কারের ব্যাপারে বিস্তারিত কোন তথ্য জানা যায় না, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে গল্পটি মেনে নেওয়া হয়, তা হল দুর্ঘটনাবশত নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীর সৈন্যদের দ্বারা এই পাথর খণ্ডটির খোঁজ পাওয়া যায়। ১৭৯৯ সালের ১৫ জুলাই নীল নদের তীরে অবস্থিত রশিদ (রোসেটা) শহরের কাছে এই কেল্লার ফাউন্ডেশনে খনন করতে গিয়ে এই পাথর ফলকটি পাওয়া যায়। দৃশ্যত এটি একটি পুরনো প্রাচীরে স্থাপন করা ছিল। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পিয়ের-ফ্রানসো বোচার্ড (১৭৭১-১৮২২), এর আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন।

রোসেটা স্টোন

রোসেটা শহর যেখানে রোসেটা স্টোন পাওয়া গিয়েছিল। টমাস মিল্টন (লুগি মেয়ারের পরে), ১৮০১-১৮০৩ দ্বারা হাতে আঁকা চিত্রকলা।

নেপোলিয়নের পরাজয়ের পরে রোসেটা স্টোন ব্রিটিশদের দখলে আসে এবং আলেকজাদ্রিয়া চুক্তির শর্তে ফরাসিদের খুঁজে পাওয়া অন্যান্য পুরাকীর্তির সাথে ব্রিটিশ সম্পত্তিতে পরিণত হয়। ফলকটি ইংল্যান্ডে পাঠানো হয় এবং ১৮০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পোর্টসমাউথ বন্দরে পৌছায়।

কিভাবে রোসেটা স্টোন পাঠোদ্ধার হয়েছিল?

চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে হায়ারোগ্লিফের ব্যবহার কমে গেলে, আস্তে আস্তে এই লিপি হারিয়ে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, গবেষকগণ রোসেটা স্টোনে গ্রিক লেখাগুলো পাঠোদ্ধারে সক্ষম হন; যা হায়ারোগ্লিফিক লিপি পাঠোদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী থমাস ইউং (১৭৭৩-১৮২৯), প্রথম দেখান রোসেটা স্টোনে হায়ারোগ্লিফ অক্ষরে কোন রাজকীয় নাম যেমন টলেমি লেখা রয়েছে।

রোসেটা স্টোন

১৮১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা হায়ারোগ্লিফ সম্পর্কে থমাস ইয়ং এর একটি চিঠি। সুপারিশকৃত অর্থগুলো বেশিরভাগই সঠিক। কিন্তু কিভাবে এই চিহ্নগুলোর অর্থ এসেছে তার কোন সঠিক বিশ্লেষণ করতে পারেননি। এগুলোকে অত্যন্ত উচুমানের অনুমান বলা যেতে পারে!

ফরাসি গবেষক জিন-ফ্রানসিস চেম্পলিয়ন (১৭৯০-১৮৩২) অনুধাবন করেন হায়ারোগ্লিফে কোন মিশরীয় ভাষা লেখা রয়েছে। যা মিশরীয় ভাষা ও সাংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি। চেম্পলিয়ন প্রাচীন মিশরীয় লেখা বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি হায়ারোগ্লিফের বর্ণমালাগুলোকে একত্রিত করে মিশরীয় নয় এমন শাসকদের নাম লেখায় ব্যবহার করলেন। রোসেটা স্টোনের লেখার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তার এই আবিষ্কারের কথা তিনি ১৮২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার প্যারিসের একাডেমি দেস ইন্সক্রিপশন্স এট বেলস লেট্রেসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ঘোষণা দেন। এর পাঠকদের মধ্যে তার ইংরেজ প্রতিদ্বন্দ্বি থমাস ইউং ছিলেন, যিনি মিশরীয় হায়ারোগ্লিফ পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

রোসেটা স্টোন

চেম্পলিয়নের হায়ারোগ্লিফ পাঠোদ্ধারের দক্ষতা।

১৮২৪ সালে চেম্পলিয়ন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বর্ণমালা চিহ্নগুলো শুধুমাত্র বিদেশি নামের ক্ষেত্রেই নয়; এগুলো মিশরীয় নাম ও ভাষা লিখতেও ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া কপটিক ভাষা, যা প্রাচীন মিশরীয় ভাষা থেকে উদ্ভূত; এর জ্ঞান মিলিয়ে এই সাফল্য তাকে হায়ারোগ্লিফ লেখাগুলো সম্পূর্ণভাবে পড়তে সক্ষম করেছিল।

কি লেখা আছে এই কালো পাথরের ফলকে?

রোসেটা স্টোনে উপর খোদাই করে পুরোহিতদের পরিষদের জারি করা একটি ফরমান রয়েছে। ১৩ বছর বয়সী পঞ্চম টলেমি এর রাজ্যাভিষেকের প্রথম বার্ষিকীতে রাজকীয় অনুষ্ঠানে সম্মতিসূচক ধারাবাহিক ফরমানের একটি ছিল এইটি। আপনি এখানে সম্পূর্ণ অনুবাদ (ইংরেজি) পড়তে পারেন।

বিগত বছরগুলোতে টলেমির পরিবার রাজ্যের কিছু অংশে আধিপত্য হাড়িয়ে ফেলেছিল। বিরোধী দলকে ঠেকাতে তাদের সৈন্যরা সময় নিচ্ছিল। নীল নদের মোহনায় ও উজানে দক্ষিণ মিশরে, বিশেষ করে থেব্‌স তখনও শাসকদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। টলেমাইক যুগের পূর্বে, হায়ারোগ্লিফসে লিখিত এই ধরনের ফরমান জারি করতো স্বয়ং রাজা। কিন্তু এই ফলকে বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতির কেমন পরিবর্তন ঘটেছিল যে কেবলমাত্র পুরহিতগণের হায়ারোগ্লিফ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল, তারাই এখন এই ধরনের ফরমান জারি করছে। মন্দির সম্পর্কিত রাজার ভাল কাজের তালিকাটিও বেশ আকষর্ণীয়। রাজ্যের কর্তৃত্ব রক্ষায় পুরহিতদের সমর্থন পেতে ফেরাউন রাজা কি কি পন্থা অবলম্বন করতেন এ থেকে তারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কোথায় আছে এখন এই রোসেটা স্টোন?

১৮০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফলকটি ইংল্যান্ডে পৌছানোর পরে, সে বছরই জুলাই মাসে তৃতীয় জর্জ কর্তৃক এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থাপন করা হয়। শুরুতে রোসেটা স্টোনসহ অন্যান্য ভাস্কর্জ ও মূর্তিগুলো অস্থায়ী ব্যবস্থায় মিউজিয়াম চত্ত্বরে রাখা হয় কারণ, মিউজিয়ামের মেঝে এগুলোর ভার বহন করার উপযুক্ত ছিল না। পার্লামেন্টে তহবিলের জন্য আবেদনের পরে ট্রাস্টিগণ এই সব পুরাকীর্তি স্থাপনের জন্য নতুন গ্যালারি তৈরী শুরু করে।

রোসেটা স্টোন

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৪ নম্বর ঘরে প্রদর্শিত রোসেটা স্টোন।

১৮০২ সাল থেকে রোসেটা স্টোন ব্রিটিশ মিউজিয়াম প্রদর্শিত হচ্ছে। মাঝে মাত্র একবার বিরতি দেওয়া হয়েছিল। ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে, যখন মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ লন্ডন শহরে জোড়ালো বোমা আক্রমণে আশংকা করেন; তখন তারা অন্যান্য ‘গুরুত্বপূর্ণ’ জিনিষের সাথে এটাকেও অন্যত্র সরিয়ে নেয়। পরর্বতী দুই বছর এই আইকনিক বস্তুটি রাখা হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫০ মিটার নিচে; হলবর্নে পোস্টাল টিউব রেইলওয়ের একটি স্টেশনে।

বর্তমানে রোসেটা স্টোনটি দেখতে পাবেন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ৪ নম্বর ঘরে (ইজিপশিয়ান স্কাল্পচার গ্যালারি); এবং অনলাইনে গুগুল স্ট্রিটভিউতে দেখতে পাবেন। ১ নম্বর ঘরে (এনলাইটমেন্ট গ্যালারি) এর একটি অবিকল নকলে স্পর্শ করতে পারবেন। রোসেটা স্টোনটি 3D তে দেখুন:

Rosetta Stone
by The British Museum
on Sketchfab

 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top