ইতিহাস

কোসেম সুলতান: অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ ক্ষমতাধর নারী শাসক

কোসেম সুলতান

কোসেম সুলতান (Kösem Sultan) অটোমান সাম্রাজ্যের একমাত্র ক্ষমতাধর নারী যার ক্ষমতা ছিল একজন সুলতানের থেকেও বেশি। অটোমান ইতিহাসে, কোসেম সুলতান শুধুমাত্র দরবারে রাজ পরিবারের একজন সাধারণ বিধবা নয়, তিনি ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের আসল অধিপতি। তিনি এমনিই ক্ষমতাশালী ছিলেন যে তার ইশারায় সুলতানের পরিবর্তন হত। তার জীবনকালে ছয় ছয়জন সুলতান অটোমান সিংহাসনে বসেন। অটোমান ইতিহাসে তার এমনই প্রভাব ছিল যে তার মৃত্যুর পর তাদের দেশের উত্তরাধিকারীরা সিদ্ধান্ত নেয় একজন মহিলাকে আর কখনও এমন ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে দেওয়া যাবে না।

১৭ শতকের শুরুর দিকে সুলতানেরা, অটোমান সম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের ঐতিহ্য ধারণ করে চলছিলেন যা শুরু হয়েছিল সুলতান প্রথম সুলাইমানের শাসনামল থেকে। সুলতান সুলাইমান যিনি ‘সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট‘ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সুলাইমানের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় সেলিম, পৌত্র তৃতীয় মুরাদ এবং প্রপৌত্র তৃতীয় মেহমেত সিংহাসনে বসেন।

মেহমেতের পরে তার পুত্র আহমেদ অটোমান সিংহাসনে বসেন। তার মা হানদান সুলতানের সহযোগিতায় তিনি সুলতান হন যখন সিংহাসনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারের বেশির ভাগ পুরুষকে হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসে তার রাজবংশের ১৯ জন  পূর্বপুরুষের অন্ত্যষ্টিক্রিয়ার কথা উল্লেখ্য আছে। বেঁচে ছিল মাত্র দুই জন। তাদের মধ্যে একজন আহমেদের ভাই এবং ভবিষৎ সুলতান প্রথম মোস্তফা। দ্বিতীয়জন ছিল তৃতীয় মুরাদ এবং সাফিয়া সুলতানের এক পুত্র। যাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাসাদের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অফিসিয়ালি, তার নামে একটি কফিন তার ভাইদের সাথে কবর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আদতে তা ছিল ফাঁকা।

ম্যাহপিকার: যে নারীর চাঁদের মত মুখ

কোসেম সুলতান

কোসেম সুলতান ও তার পুত্র মুরাদ অথবা ইব্রাহিম (Wikimedia Commons)

তোপকাপির প্রাসাদে জীবন ছিল বিপদজনক। তবুও সকলের মতই সুলতান আহমেদও খুঁজেছিলেন তার ভালবাসাকে। তিনি এমন একজনকে তার পাশে চাইছিলেন যাকে তিনি বিশ্বাস করতে পারেন এবং যার কাছে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেন। সেই লোকটিকে অবশেষ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক নারীর মাঝে যিনি ছিলেন বসনিয়া বা সম্ভবত পেলপোনেস এর মোরিয়া থেকে আনা এক দাসী।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল আনাস্তাসিয়া, কিন্তু পরে তুর্কি নাম ম্যাহপিকার গ্রহণ করেছিলেন, ফারসি ভাষায় যার অর্থ হল ‘চাঁদের মত মুখ’। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী ও বুদ্ধিমতি। অনেক ঐতিহাসিক গণ মনে করেন তিনি ছিলেন খুব চালাক-চতুর ও কৌশলী। আহমেদ তাকে কোসেম নামে ডাকতেন, যার অর্থ “ভেড়ার পালের নেত্রী” (বা রাখাল)।

কোসেমকে তার বাড়ী ও পরিবারের থেকে অপহরণ করে তোপকাপির প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে তিনি সুলতান আহমেদের প্রিয়তমদের একজনে পরিণত হয়ে ওঠেন। কালক্রমে তিনি সাফিয়া সুলতান, আহমেদের ক্ষমতাশালী দাদী (যার ইতিহাস শুরু হয়েছিল সুলাইমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্টের দরবারে), এবং হানদান সুলতানের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে, তার অভূতপূর্ব উজ্জ্বল মানসিকতা, রাজনৈতিক দক্ষতা এবং অনন্যসাধারণ প্রতিভা তাকে ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্যের শাসক এবং অধিপতি হতে সহযোগিতা করে।

সুলতান আহমেদের মৃত্যু

১৬১৭ সালের নভেম্বরে সুলতান আহমেদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, যদিও ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল বলে মনে করেন। ধারনা করা হয় সুলতানকে তার খুব কাছের কেউ হত্যা করেছিল – এমনকি তার প্রিয় স্ত্রীও হতে পারেন। সুলতান মারা যাওয়ার আগে কোসেম পাঁচ পুত্রের জন্ম দেন। তবে সুলতানের আরেক প্রিয়তম, মাহফিরোজ, ছিলেন তার জেষ্ঠ্য পুত্র ওসমানের মা। দরবারে অনেক বছর শান্তির পর শুরু হয় সিংহাসন দখলের লড়াই।

কোসেম সুলতান

সুলতান প্রথম আহমেদ (Public Domain)

কোসেম সুলতান ২৮ বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। তথ্যসূত্র বলে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তার এবং নিজের সন্তানদের কল্যাণের উপর জোর দিয়েছিলেন। যদিও তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের শাসক হতে চেয়েছিলেন নাকি সন্তানদের সুরক্ষা করা ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে তাদের সাহায্য করাই তার উদ্দেশ্য ছিল তা আজও অজানা। তবে আহমেদের মৃত্যুর পরবর্তী ছয় বছর তিনি তোপকাপি প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে তথাকথিত পুরানো প্রাসাদে নির্বাসিত ছিলেন। সিংহাসন ছিল তখন প্রথম মোস্তফা (যে ছিল ক্ষমতাহীন তবে বেঁচে গিয়েছিলেন) ও দ্বিতীয় ওসমানের দখলে। কয়েক বছর পরে, অবশেষে কোসেম সুলতানের ভাগ্যের সিকে ছিঁড়ে।

দুই সুলতানের একজন শাসক

রাজনৈতিক খেলায় কোসেম সুলতান ফিরে আসেন ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে। যখন তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসলেন, তখন তিনি আগের চেয়ে আর বেশি ক্ষমতাবান এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। মনে করা হয় প্রথম মোস্তফা এর  মা হালিমে সুলতানের যোগসাজোশে তার চক্রান্তে ওসমান জেনিচেরিদের হাতে নিহত হন। কৌসলে কোসেম সুলতান তার পুত্র – সুলতান চতুর্থ মুরাদের সাথে ওয়ালিদে সুলতান এবং শাসক (নায়েব-ই-সুলতানাত) হিসেবে তোপকাপি প্রাসাদে ফিরে আসেন। এই সময়ে হালিমে সুলতান এবং তার পুত্র মোস্তফা, যে কি না মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিল ক্ষমতার পালা বদলে জীবন ফিরে পেয়েছিলেন।

ওয়ালিদে সুলতান (সুলতানের মা, যিনি হেরেম পরিচালনা করেন) এবং শাসক হিসেবে, সবাই কোসেমের ভিন্ন চেহারা দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি সহজেই সুলতানের মত শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান শাসকে পরিনত হলেন। চতুর্থ মুরাদ তার রাজত্বকালের পুরোটাই সাম্রাজ্য শাসন করে অক্ষম ছিলেন। এমনকি ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের পরে শাসনকার্য ছেড়ে দেওয়ার পরেও কোসেম তার হাতেই মূল ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন।

১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে মুরাদের মৃত্যুর পর, তার আরেক সন্তান – ইব্রাহিমকে সিংহাসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ইব্রাহিম ছিলেন কোসেমের সর্বশেষ জীবিত শাহজাদা এবং তাকে সঙ্গে নিয়ে কোসেম পরবর্তী আট বছর অটোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগষ্ট, সুলতান প্রথম ইব্রাহিমকে সিংহাসন চ্যুত করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার উত্তরাধিকারী ছিলেন চতুর্থ মেহমেত, যিনি সুলতান ইব্রাহিম ও তুরহান হেতিজে সুলতানের সন্তান। ১৮ আগষ্ট, ১৬৪৮ তারিখে ইব্রাহিমের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয়। নতুন ওয়ালিদে সুলতান ছিলেন তুরহান, যিনি তার শ্বাশুড়ির ক্ষমতাকে চিরতরে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন।

যে নারীর ক্ষমতায় থেকে মৃত্যু হয়

 কোসেম সুলতান

কোসেম সুলতানের হত্যাকাণ্ড (Wikimedia Commons)

কোসেম সুলতান ক্ষমতার প্রতি তার উচ্চ আকাঙ্খার কারণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাকে হত্যা করে এক দাসী যে তুহরান হেতিজে সুলতানের অনুগত ছিল। বহুবছর আধিপত্যের পর, কোসেম সুলতান একইভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ঠিক যেভাবে বহুবার অন্যদের সাথে তিনি করেছিলেন। সন্তান মেহমেতকে রক্ষা করতে কোসেমের শাসনের শেষ চেয়েছিলেন তুরহান সুলতান, তিনি ইব্রাহিমের মৃত্যুর জন্য কোসেমকে দোষী করেন। তার ভয় ছিল হয়ত কোসেম সুলতান পুনরায় রাজকার্যে ফিরে আসার চেষ্টা করবেন।

কোসেম তার জীবনকালে (এবং এ সময়ে রাজত্ব করা ছয়জন সুলতান) রাজপ্রাসাদের বহু ধন-সম্পদ খরচ করেন। কোসেম তার রাজনৈতিক শত্রুদের কখনও দয়া না দেখালেও, দ্ররিদ্র মানুষ যারা তার সাহায্য প্রার্থনা করেছেন সকলের প্রতি যত্নশীল ছিলেন। তার স্বামী আহমেদের নাম শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে স্মরণ করা হয় অসাধারণ সুন্দর সুলতান আহমেদ মসজিদের জন্য, যা আহমেদের নির্দেশে নির্মাণ করা হয়েছিল। কোসেম সুলতানের মৃত্যুর পরে, প্রভাবশালী পাশাগণ সিদ্ধান্ত নেন যে, আর কোন নারীকে অটোমান সাম্রাজ্য শাসনের ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। এর মাধ্যমেই তোপকাপি প্রাসাদের নারীদের প্রভাবশালী সময়ের ইতি ঘটে। যার শুরু হয়েছিল ১৬ শতকের প্রথম ভাগে হুররাম সুলতানের সময়ে। তুরহান তার সন্তান সুলতান চতুর্থ মেহমেতের সাথে ক্ষমতায় ছিলেন, কিন্তু তিনি কোসেম সুলতানের মত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেননি। অবশ্য তার এমন কোন ইচ্ছাও ছিল না।

বর্তমান সময়ে, অনেক উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র হিসেবে কোসেম সুলতানকে দেখা যায়। যেখানে তাকে একজন বিশ্বস্ত স্ত্রী ও মা এবং একজন ক্ষমতাশালী নারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তোপকাপি প্রাসাদে আধিপত্যের জন্য যার জীবনকে দেখা যায় এক বড় যুদ্ধের মতন। তবে তিনি ছিলেন ইতিহাসে উল্লেখিত অন্যান্য নারীদের চেয়েও অধিক শক্তিশালী এবং জাত রাজনীতিবিদ। সুলতানের জন্য তিনি কোন সাজসজ্জার বস্তু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মহিলা কাফতান পড়া এক জাঁদরেল ব্যক্তিত্ব।

তথ্যসূত্র:

  • Peirce, Leslie P., The Imperial Harem: Women and Sovereignty in the Ottoman Empire, 1993.
  • Freely, John, Inside the Seraglio: Private Lives of the Sultans in Istanbul, 1999.
  • Goodwin, Godfrey, The Private world of Ottoman Women, 1997.
  • The woman who oversaw 3 generations of the Ottoman Empire by Ekrem Bugra Ekinci, available at: http://www.dailysabah.com/feature/2015/09/18/the-woman-who-oversaw-3-generations-of-the-ottoman-empire

Featured Image: Kösem a portrait of the representation of the Sultan. (CC BY-SA 4.0)

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top