ইতিহাস

তোপকাপি: অটোমান সাম্রাজ্যের স্বপ্নের আর অশ্রুতে সিক্ত এক প্রাসাদ

এশিয়া ও ইউরোপের সীমানায় বসফরাস প্রণালীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিলো এক প্রাসাদ, নাম তোপকাপি। অটোমান ইতিহাসের গৌরবের দিনগুলোর স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে সেই তোপকাপি প্রাসাদ, অজস্র জানা-অজানা হৃদয় বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়ে। বর্তমানে তোপকাপি প্রাসাদ কেবলমাত্র একটি জাদুঘর হলেও মাত্র ১০০ বছর আগেও তা ছিল সুলতানের “হারেম” – তার পরিবার ও দাস-দাসীদের বাসস্থান।

প্রাসাদটি ১৪৬৬ থেকে ১৪৭৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মাণ করেন সুলতান দ্বিতীয় মেহমেত। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুল শহর বিজয়ের পরে, সাম্রাজ্য পরিচালনা এবং বসবাসের জন্য একটি নতুন প্রাসাদের প্রয়োজন দেখা দেয়। তোপকাপি প্রাসাদটি বাইজেন্টাইন শাসনামলের ধ্বংসাবশেষের উপরে নির্মিত হয়েছিল। এর কারণ অটোমান শাসকেরা নিজেদের প্রাচীন ক্ষমতা ও শক্তির ধারক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চেয়েছিল, নতুন কোন শক্তি হিসেবে নয়। ১৫ শতকের শেষের দিকে এই প্রাসাদটি সুলতানের মূল বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছিল।

তুর্কি ভাষায়, “তোপকাপি” অর্থ হল “তোপের ফটক”। প্রাসাদের ফটক বা দরজার বাইরে বিশাল বিশাল কামান বা তোপ প্রদর্শিত হত বলে প্রাসাদটির এই নামকরণ হয়েছিল। এগুলো ইস্তাম্বুল শহর বিজয়ের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯২৪ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তোপকাপি প্রাসাদকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হবে। এটাই তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রথম জাদুঘর। বসফরাসের কাছে শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে প্রাসাদটির অবস্থান, পাশেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত সুলাইমানিয়া মসজিদ ও সুলতান আহমদ মসজিদ। প্রাসাদের আশেপাশের কাঠের ইমারতগুলো সরিয়ে নতুন ইমারত দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হলেও, মূল প্রাসাদ ভবন এখনও অক্ষত রয়েছে।

সুলতানের তিন বসতী

মূল প্রাসাদে ৭০০-৮০০ লোকের বাসস্থান থাকলেও, কালক্রমে লোক সংখ্যা বেড়ে ৫,০০০ হয়েছিল। প্রাসাদটির তিনটি প্রধান অংশ রয়েছে: পুরাতন প্রাসাদ, নতুন প্রাসাদ এবং ইলদিজ প্রাসাদ। নতুন প্রাসাদ অংশটি তোপকাপি নামে বেশি পরিচিত।

Topkapi Palace overview EN

প্রাসাদের সংক্ষিপ্ত মানচিত্র

প্রথমে পুরনো প্রাসাদ অংশটি করা হয়েছিল। ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে অগ্নিকাণ্ডে প্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল, এর পরে অধিকাংশ লোক নতুন প্রাসাদে বসবাস করা শুরু করেছিল। পুরনো প্রাসাদটি আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার ও পুনঃ নির্মাণ করা হয়েছিল, কিন্তু এটি আরও একবার আগুনে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সুলতান আব্দুল আজিজের শাসনামলে, যিনি ১৮৬১ থেকে ১৮৭৬ পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। এই সময়ে প্রাসাদের সামনে সেনাপ্রধান ফটক বসানো হয়। বর্তমানে এটা ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ।

নতুন প্রাসাদের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন দ্বিতীয় মেহমেদ আর নতুন এই প্রাসাদ ছিল আরও বিলাসবহুল। এই অংশটি পুরো প্রাসাদের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে রয়েছে রাজকীয় ভবন, প্রমোদ তাবু, হাম্মাম (গোসলখানা), ওয়ার্কশপ, রান্নাঘর, আবাসিক কোয়ার্টার ইত্যাদি। সুলতানের ব্যাক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের সকল কর্মকাণ্ড ছিল প্রাসাদের এই অংশকে কেন্দ্র করে। তাই সুলতান এখানেই তার উপদেষ্টাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, যুদ্ধ জয়লাভে এখানেই তার সৈন্যরা বিজয় উদযাপন করতো, এখানেই বিভিন্ন কৌশল ঠিক করা হত। কালক্রমে প্রাসাদের এই অংশটি পারিবারিক জীবন ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

তোপকাপি প্রাসাদ

সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ যার আদেশে প্রাসাদ নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে। (Wikimedia Commons)

১৮ শতাব্দীতে ইস্তাম্বুলের বেসিকতাসে নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। এটা ছিল সুলতান তৃতীয় সেলিমের (১৭৮৯-১৮০৭) গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জায়গা। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (১৮০৮-১৮৩৯), দরবারের ভীড় থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি এখানে প্রচুর সময় ব্যয় করতেন। ইলদিজ প্রাসাদ ছিল শাসকদের জন্য একটি মরূদ্যান, যেখানে রাজধানী ত্যাগ না করেই বিশ্রাম নেওয়ার মত একটা জায়গা পাওয়া যায়। তবে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ সম্পূর্ণ দরবার এখানে স্থানান্তর করলে, ইলদিজ প্রাসাদ সম্পর্কে এই ধারণার বদল হয়েছিল।

অটোমান হারেমের হৃদয়

হারেম ছিল শত শত নারী ও শিশুদের বাসস্থান। এখানে শাহজাদাদের বাসস্থান ছিল যতদিন না তাদের ১৬ বছর বয়স পূর্ণ না হয়। অটোমান হারেমে নারীরা সবচেয়ে ভাল শিক্ষা লাভ করতো এবং তাদেরকে প্রাসাদের সর্বোচ্চ সম্মানী দেওয়া হত।

তোপকাপি

সুলতানের হারেমের কাল্পনিক চিত্র। ( Public Domain )

“হারেম” শব্দটি এসেছে আরবি “হারাম” শব্দ থেকে যার অর্থ হচ্ছে “নিষিদ্ধ”। খুব কম সংখ্যক পুরুষই হারেমে ঢুকতে পারতো। পূর্বে, তা সুলতানের প্রাসাদ থেকে সম্পূর্ণ আলদা ছিল। কিন্তু হারেমের এক সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী নারী সুলতান সুলাইমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্টের হৃদয় হরণ করলে অবস্থার পরিবর্তন হয়। তার জন্ম হয়েছিল পোল্যান্ডের কোন এক রাজ্যে, নাম ছিল আলেক্সান্দ্রিয়া। কিন্তু সুলতান তাকে হুররাম – অর্থ আনন্দময় একজন বলে ডাকতেন। তিনি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং সুলতানের সাথে সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য তার ভাগ্যের সহযোগিতারও প্রয়োজন হয়েছিল। অ্যান্ড্রু কোল্ট তার বইয়ে লিখেছেন:

“যখন অগ্নিকাণ্ডে স্যারাগলিও (পুরনো প্রাসাদ) এর বড় রকমের ক্ষতি হয়, তখন এই সুযোগে রোক্সেলানে নতুন প্রাসাদে বসবাসের অনুমতি প্রার্থনা করে – যা আমাদের কাছে তোপকাপি প্রাসাদ নামে পরিচিত – যা সুলতানের রাজনৈতিক জীবন ও দরবারের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে সুলতানের একটি কামরাও রয়েছে। রোক্সালেনা তার সাথে করে বেশ কিছু অনুগত সাদা ও কালো দাস-দাসী, নপুংসক বা খোজা নিয়ে এসেছিলেন; সবকিছু এখানে স্থাপন করার পরে, তিনি এখানে বাস করতে শুরু করেন। হারেম ও রাজ্য আর আলাদা রইল না; যার পরিণতি ছিল হতাশাজনক।”

হারেমের সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ওয়ালিদে সুলতানের কামরায়। ওয়ালিদে সুলতান হলেন রানী মাতা এবং তিনিই ছিলেন অটোমান রাজকীয় হারেমের সর্বেসর্বা। সাধারণত সুলতানের মা অথবা স্ত্রী হারেম পরিচালনা করতেন। প্রথম মহান ওয়ালিদে সুলতান ছিলেন হাফসা সুলতান, যিনি সুলতান সুলাইমান দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট এর মা ছিলেন। তবে ওয়ালিদে সুলতানের কথা বললে দ্বিতীয় সেলিমের স্ত্রী নুরবানু সুলতান এবং প্রথম আহমেদের স্ত্রী কোসেম সুলতানের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কারণ এই সব নারীরা ছিলেন প্রভাবশালী ও বিপুল ক্ষমতা অধিকারী এবং নিজেদের দক্ষতা দিয়ে প্রত্যেকেই হারেম থেকে আয়ের বহু গুণ বৃদ্ধি করেছিলেন।

তোপকাপি

সুলতান মাতার বা ওয়ালিদে সুলতানের একটি প্রতিচ্ছবি। ডানে হারেমের খোজার মাথা দেখা যাচ্ছে।

তোপকাপি হারেমের অনেক সাজসজ্জায় এখনও ১৬ শতকের নারী শাসকের চিহ্ন রয়েছে, তবে বেশির ভাগ বস্তুই উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরু দিককার।

তোপকাপি প্রাসাদের নতুন জীবন

তোপকাপি

তোপকাপি প্রাসাদ, ইস্তাম্বুল, তুরস্ক। (CC BY-SA 3.0 )

প্রাসাদে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, যার আর্কাইভে রয়েছে আনুমানিক ৩,০০,০০ নথির সংগ্রহ। এছাড়াও তোপকাপির বাগানে রয়েছে কচুরিপানা, গোলাপ, টিউলিপ সহ আরও অনেক জাতের ফুলের গাছ যা আজও অটোমান ঐতিহ্য বহন করছে।

জাদুঘরে রূপান্তর করে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতন অটোম্যান প্রাসাদ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। জাদুঘরে রয়েছে গত ৪০০ বছর ধরে এ প্রাসাদে বসবাসকারীদের রেখে যাওয়া প্রচুর ধন-দৌলত। আকর্ষনীয় সংগ্রহগুলো যা এর খাজাঞ্চিতে রয়েছে সেগুলো এর সংগ্রহের খুব ছোট্ট একটা অংশ, যা অন্য কোথাও লুকিয়ে জমা রাখা হয়েছে।

তোপকাপি

তোপকাপি জাদুঘরে সংরক্ষিত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাঁত (বামে), পদচিহ্ন (মধ্যে), রওজার ধুলো (ডানে)। (Wikimedia Commons)

সুলতান ও সুলতানের পরিবারের প্রতিকৃতি সমূহ, তাদের ব্যবহার করা আসবাবপত্র সমূহ, ধন-রত্ন ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সাথে এখানে আরও প্রদর্শিত হয় ধর্মীয় নিদর্শন – এর মধ্যে অন্যতম হল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিভিন্ন জিনিসপত্র।

তোপকাপি প্রাসাদ এখন সারা বছরই পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো তোপকাপি প্রাসাদকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। অটোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে সকল রকম জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে এই প্রাসাদ। এছাড়াও যারা এই মহান প্রাসাদে যুগের পর যুগ জীবন কেমন ছিল তা অনুভব করতে চায় তাদের জন্য একটি বিশ্রাম ও প্রশান্তির একটি জায়গা হল এই তোপকাপি প্রাসাদ।

তথ্যসূত্র:

  • Kemal Cig Sabahattin, Cengiz Koseoglu, The Topkapi Saray Museum – Architecture, 1988.
  • Andre Colt, Suleiman the Magnificent, 2005.
  • http://topkapisarayi.gov.tr/en/history
  • http://www.greatistanbul.com/topkapi_palace.html
  • http://kilyos.ee.bilkent.edu.tr/~history/intro.html

Feature image: By Bjørn Christian Tørrissen [CC BY-SA 3.0 (https://creativecommons.org/licenses/by-sa/3.0) or GFDL (http://www.gnu.org/copyleft/fdl.html)], via Wikimedia Commons

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top