ইতিহাস

অটোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী নারী স্বর্ণ রাণী সাফিয়া সুলতান

সাফিয়া সুলতান

সাফিয়া সুলতান ছিলেন তৃতীয় মুরাদের প্রধান সঙ্গী ও তৃতীয় মেহমেদ এর ওয়ালিদে সুলতান বা রাণী মাতা। অটোমান ইতিহাসে তিনি হলে সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রধান সঙ্গী এবং ওয়ালিদে সুলতান। পূর্ববর্তী সুলতানের প্রধান সঙ্গী অথবা ওয়ালিদে সুলতানদের সঙ্গে তার পার্থক্য হচ্ছে ক্ষমতার উচ্চ শিখরে চড়তে তাকে অন্যদের মতন মহান প্রেম কাহিনীর প্রয়োজন হয়নি এবং তিনি কখনই তার বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রদর্শনে দ্বিধাবোধ করতেন না।

হারেমের অন্যান্য নারীদের মত, তার পূর্ব ইতিহাস স্পষ্ট নয়। বিতর্ক রয়েছে তিনি ভেনিসীয় বংশোদ্ভুত, তবে অনেকেই দাবি করেন তিনি ছিলেন আলবেনীয় বা বসনীয়। তিনি যেখানকারই হন না কেন, এটা পরিষ্কার যে তিনি কোন কৃষক পরিবার থেকে আসেননি। তার পরবর্তী কর্মকাণ্ডেও দেখা যায় যে তার খুব উচুমানের শিক্ষা এবং কূটনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন ছিলেন।

সাফিয়া সুলতান: সোনালী চুলের অপরূপ সুন্দরী

১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে শাহজাদা ও ভবিষ্যৎ সুলতান তৃতীয় মুরাদের জন্য উপহার হিসেবে ফেরহাদ পাশা তাকে মানিশায় এনেছিলেন। তার সোনালী রঙের চুল এবং উজ্জ্বল গায়ের রঙের কারণে তাকে সাফিয়া (বিশুদ্ধ একজন) নামে ডাকা হত। তোপকাপি প্রাসাদে তার শিক্ষার কোন তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তিনি ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে তার প্রথম সন্তানের (ভবিষ্যতে তৃতীয় মেহমেদ) জন্ম হয়। সুলতানের প্রথম সন্তানের মা হওয়াতে, হারেমে তার ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা অন্যদের তুলনায় বেশি ছিল। অস্বাভাবিকভাবে বেশ কয়েক বছর তিনি মুরাদের একমাত্র নারী সঙ্গী ছিলেন, কিন্তু তাদের দ্বিতীয় কোন সন্তান হয়নি। এই সময়ে, সাফিয়া সুলতান যুক্তি মেনে নিয়ে কোন রকম ঈর্ষা ছাড়াই মুরাদের জন্য আরও উপপত্নী গ্রহণে সম্মতি দিয়েছিলেন। উপরন্তু, তিনি নিজের পছন্দে উপপত্নী সুলতানের কাছে পাঠাতেন যেন তিনি সুলতানের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন। সুলতান তৃতীয় মুরাদ বিভিন্ন নারী সঙ্গীর ঘরে ৫০ জন সন্তান লাভ করেন, এদের মধ্যে ২৫ জন পুত্র সন্তান ছিলেন।

সাফিয়া সুলতান

সুলতান তৃতীয় মুরাদ (Public Domain)

প্রভাবশালী ও ধনী সুলতানা

মুরাদের শাসনামলে, প্রথম শাহজাদা মা হওয়ার কারণে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি ভাল ভাবেই উপভোগ করেছেন। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের পরে তিনি হারেমে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হন। তখন তিনি শুধু হারেমে নয়, রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়েও হস্তক্ষেপ শুরু করেন। এছাড়াও তিনি সাম্রাজ্যের বৈদেশিক কূটনৈতিক বিষয়েও বেশ সক্রিয় ছিলেন; এমন কি তিনি ইউরোপীয় শাসকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন। তিনি রাণী প্রথম এলিজাবেথের কাছ থেকে একটি সোনালী গাড়িও উপহার পেয়েছিলেন। তিনি আড়ম্বরপূর্ণ এই গাড়িতে করে সারা শহর ঘুরে বেড়াতেন, যা তার সুনামহানি করেছিল। কারণ তখনকার দিনে অটোমান সাম্রাজ্যে গাড়িতে নারীদের দেখতে পাওয়াটা অদ্ভুত মনে করা হত। তাছাড়া, রাষ্ট্রদূতেরাও সোনা ও মূল্যবান উপহারের প্রতি তার অনুরাগের কথা জানতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী নারীতে পরিণত হন। তিনি তার শাশুড়ী নুরবানু সুলতানের মতই বৈদেশিক রাজনীতিতে কট্টর ভেনিসীয় নীতির সমর্থক ছিলেন। সাফিয়া সুলতানের সাথে ভেনিসীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক ছিল, যিনি কখনও তার জন্য উপহার ও স্বর্ণ পাঠাতে ভুল করতেন না।

সাফিয়া সুলতান

সুলতান সুলেমানঃ কোসেম টিভি সিরিয়ালে সাফিয়া সুলতান চরিত্রে হুলিয়া আবসার। (fair use)

অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক রাজনীতিতে পটু এক নারী

১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে যখন তিনি ওয়েলিদে সুলতান হন, তখন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এবং বৈদেশিক বিষয়ে ভেনিসের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছিলেন। এ সময় তিনি প্রাসাদে তার ক্ষমতা আরও মজবুত করেছিলেন। পুত্রের কারণে সৈন্যদের সাথে তার বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাকে কঠিন অভ্যন্তরীণ সংকটের মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তার পুত্রকে সহযোগিতা করতে তিনি তার ব্যক্তিগত খাত থেকে যুদ্ধের খরচের অর্থ পরিশোধ করেছিলেন। রাজ্যের কর্মচারী ও সেবকগণ দরবারে তার ক্ষমতা ও প্রভাব সম্পর্কে জানতো বলে যেকোন সাহায্যে তার দ্বারস্থ হতেন। অনেকে তার সমর্থন পেতে তার সামনে উজার করে দিতেন। সাম্রাজ্যের যেকোন কর্মচারী ছাটাই ও নিয়োগে তিনি ছিলেন দরবারে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাক্তি। এমন কি উজিরে-আজম ও শায়খ-উল-ইসলাম নিয়োগেও তিনি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ওয়ালিদে সুলতান হিসেবে সাফিয়া সুলতান তার জন্য সর্বোচ্চ ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। পুত্রের শাসনামলের শেষের দিকে ভাতা হিসেবে তিনি দৈনিক ৩,০০০ আকচে নিতেন। হালিমে সুলতানও দৈনিক ৩,০০০ আকচে ওয়ালিদে সুলতান হিসেবে ভাতা গ্রহণ করতেন। তার দুই পুত্রের শাসনামলের মাঝের সময়ে হালিমে সুলতান যখন পুরনো প্রাসাদে নির্বাসিত ছিলেন তখনও দৈনিক ২,০০০ আকচে ভাতা গ্রহণ করেছিলেন। এমন কি তখনও পুরনো প্রাসাদে সাফিয়া সুলতান যত দিন জীবিত ছিলেন দৈনিক ৩,০০০ আকচে ভাতা গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সুলতান প্রথম আহমেদের হাসেকি সুলতান কোসেম সুলতান যখন পুরনো প্রাসাদে ছিলেন তিনি দৈনিক ১,০০০ আকচে ভাতা গ্রহন করেছিলেন।

সাফিয়া সুলতান

ইয়ানি বা নতুন মসজিদ, ইস্তাম্বুল (Wikimedia Commons)

যদিও সাফিয়া সুলতান উচ্চ ভাতা গ্রহন করতেন, তার উদারতা এবং দাতব্য কাজের জন্য তিনি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছিলেন। সবচেয়ে বিখ্যাত যে জিনিস নিতি নির্মাণ করেছিলেন তা হল নতুন মসজিদ। ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে সাফিয়া সুলতান এই নতুন মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। এটাই ছিল অটোমানদের নির্মিত শেষ বড় কোন মসজিদ। সাফিয়া সুলতানের মৃত্যুর পর এর নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গেলে, কিছু দিনের জন্য মসজিদটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় থাকে। অবশেষে মসজিদটির নির্মাণ কাজ ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়।

ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় যার পতন

১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে তার পুত্রের সাথে শাহজাদা মাহমুদের (তার বড় নাতি) এক দ্বন্দ্বের পরে তিনি শাহজাদা মাহমুদের মৃত্যুদণ্ডে সমর্থন দেন। সেবছরই শাহজাদা মাহমুদ ও তার মায়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। এর পরেই তার জীবনে দুঃখের দিন শুরু হয়; ২১ ডিসেম্বর তার পুত্র মারা যান, এর সাথে সাথে তিনি ওয়ালিদে সুলতান এবং দরবারে তার পদ হারিয়ে ফেলেন। তিনি পুরনো প্রাসাদের নির্বাসিত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তার ভাতা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছিলেন। তার নাতির শাসনামলে, ছোট সফর ছাড়া তিনি মূল দরবারে ফিরে আসতে পারেননি। ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে দরবারে ফেরার সময় তার গাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেদিনই মারা যান। তাকে তৃতীয় মুরাদের সমাধীতে সমাহিত করা হয়।

সাফিয়া সুলতান

সুলতান তৃতীয় মুরাদের সমাধী। (Wikimedia Commons)

সুলতান সাফিয়ার গল্পের শেষে কোন মহান প্রেম ছিল না, ছিল শাসন করার তীব্র আকাঙ্খা। তিনি সবাইকে দেখিয়েছিলেন, যদি কোন নারীর শাসন করতে চায়, তাহলে তাকে পর্দার আড়ালে থাকা জরুরী নয়।

 

তথ্যসূত্র:

  • Sakaoğlu Necdet, Bu Mülkün Kadın Sultanları
  • TDV İslam Encyclopedia, page 373
  • Börekçi Günhan, İnkırazın Eşiğinde Bir Hanedan, III. Mehmed I. Ahmed I. Mustafa ve 17. yüzyıl Osmanlı Siyasi Krizi, year 2009, page 90
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top