খেলাধুলা

ঈশ্বরের হাতে গোল ও ফকল্যান্ড যুদ্ধ

ঈশ্বরের হাতে গোল

১৯৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে, আর্জেটিনা মুখোমুখি হয়েছিলো ইংল্যান্ডের। খেলার প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিলো গোলশূণ্য, যদিও ১৩ মিনিটের মাথায় ইংলিশদের ভাল সুযোগ এসেছিলো স্কোর করার। খেলার দ্বিতীয়ার্ধের ৬ মিনিটের সময় একটি বল ইংল্যান্ডের পেনাল্টি বক্সে উড়ে এলে, সেটি পাঞ্চ করতে গোললাইন ছেড়ে এগিয়ে যান ইংলিশ গোলকিপার পিটার শিলটন। ৬ ফুট ১ ইঞ্চির শিলটন থেকে ৮ ইঞ্চি ছোট ম্যারাডোনা বলটির নাগাল পেতে মাথা দিয়ে হেড করার ভঙ্গিমায় লাফিয়ে উঠে, তার বাম হাত দিয়ে বলটি ছুঁয়ে দিয়ে গোল করেন। সেদিনের সেই ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনেই ম্যারাডোনা বলেছিলেন,

“ম্যারাডোনার মাথার সাথে, ঈশ্বরের সামান্য একটু হাতও ছিলো গোল করার সময়।”

ফুটবল ইতিহাসে ম্যারাডোনার এই গোল “ঈশ্বরের হাতে গোল” নামে খ্যাত হয়ে যায়। তবে এই গোলটির ৪ মিনিট পরেই ম্যারাডোনা নৈপুণ্যের সাথে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে সুরক্ষা বুহ্য ভেঙ্গে ঢুকে গিয়ে করেন “শতাব্দীর সেরা গোল”। সেই ঈশ্বরের হাতে গোল ও শতাব্দীর সেরা গোলের ওপর ভর করে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে দেন ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয় লাভ করে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ

Folkland War and God's goal

কার্টুন: ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধের রূপক হিসাবে, ইশ্বরের হাতের গোল।

ঈশ্বরের হাত গোল এর চার বছর পূর্বে, আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মধ্যে দশ সপ্তাহ ব্যাপী এক রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিলো। ফকল্যান্ড নামক এক দ্বীপের দখলকে কেন্দ্র করে সেই যুদ্ধে ইংল্যান্ড জয়ী হয়েছিলো। আর্জেন্টিনার সাড়ে ছয়শত সৈনিক নিহত এবং হাজারের ওপরে সৈনিক বন্দি হয়েছিলো। আর্জেন্টিনা ১টি ক্রুজার, ১টি সাবমেরিন,  ২৫টি হেলিকপ্টার ও ৩৫টি ফাইটার জেট হারিয়েছিল। সবার ওপরে তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলো, যা ভোলার জন্যে চার বছর কোন সময়ই না। ছিয়াশি’র বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে বিদায় করতে পেরে আর্জেন্টিনার জনগণ হয়ত ফকল্যান্ড হারের কষ্ট কিছুটা ঘোচাতে পেরেছিল। অপর দিকে ইংল্যান্ডের জনগণের মনের অবস্থা কি হয়েছিলো তাও সহজেই অনুমেয়। ঈশ্বরের হাত গোল কোন একপক্ষ মেনে নিতে না পারলেও,  আরেক পক্ষ ঈশ্বরের হাত হিসেবেই বিশ্বাস করেছিলো।

ইশ্বরের হাত গোল হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্ত। Photo:rarehistoricalphotos.com

২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার সময়সূচী জানতে ভুসুকেতে দেখুন, ২০১৮ রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপ সময়সূচী।

দ্য সান এর সাক্ষাৎকার

কিন্তু আজ হতে ১০ বছর পূর্বে ম্যারাডোনা যখন ইংল্যান্ড ভ্রমণে গিয়েছিলেন তিনি ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড “দ্য সান” কে সাক্ষাৎকার প্রদানকালে বলেছিলেন, তিনি দুঃখিত। ঈশ্বরের হাতে গোল এর জন্য ক্ষমা চাইলেন কিংবদন্তী খেলোয়াড় ম্যারাডোনা। ইংলিশ ফুটবল ভক্তদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২২ বছর, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কিছুটা হলেও থেমেছিল।

টম ওয়েলস নামক এক রিপোর্টার, ২০০৮ সালে একজন দোভাষীর মাধ্যমে ম্যারাডোনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। টম ওয়েলস বলেন যে, আমরা তাকে খুব সহজ সরল ভাবে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যদি আপনার সুযোগ হয় সময়ের পেছনে গিয়ে পরিস্থিতি বদলে দেবার… এবং আপনি যে হাতের গোল করেছিলেন তার জন্যে ক্ষমা চাইবার… এবং একই সাথে ইংলিশ ফুটবল ভক্তদের মাঝে আপনার যে সম্মানের ঘাটতি হয়েছে তা ঠিক করার… আপনি কি তা করবেন?

টম ওয়েলসের ভাষ্যমতে, ম্যারাডোনা “হ্যাঁ” বলেছিলেন আর সাথে তিনি এটিও যোগ করেছিলেন, “আমি পারলে ইতিহাস বদলে দিতাম”।

টম ওয়েলস নিশ্চিত করেছেন যে, দোভাষীর মাধ্যমে কথোপকথনের সময়, অনুবাদ করতে গিয়ে তথ্যের কোন বিভ্রাট হয়নি। তিনি বলেন, আমরা আসলে তাঁকে বলেছিলাম আপনি চাইলে আপনার নিজের দোভাষী আনতে পারেন, আমরা চাইনা কোন ভুল বোঝাবুঝি হোক। তো সাক্ষাৎকার দিতে তিনি দোভাষী এনেছিলেন আর তার নিজের দোভাষী সকল বক্তব্য অনুবাদ করে আমাদের জানিয়েছিলেন।

“তাই আমি মনে করি তিনি যা বলেছিলেন তা তিনি সম্পূর্ণ খুশি মনেই বলেছিলেন, যদিও কথাগুলো বলতে তিনি বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বলেছিলেন, কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন। যদিও তিনি কিছুটা একগুঁয়ে মানুষ, তবে তিনি মেনে নিয়েছিলেন যে এখন সময় এসেছে ভেদাভেদ সরিয়ে রেখে, দীর্ঘদিনের তিক্ততা কাটিয়ে একটি মধুর অধ্যায় আরম্ভ করা যেতেই পারে”

পরের ঘটনা

তবে সবচে’ আশ্চর্যজনক বিষয় হল, ২০০৮ সালের ওই সাক্ষাৎকারের পরে, ম্যারাডোনা সান পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ইন্টারভিউয়ের সম্মানী বাবদ চুক্তি অনুযায়ী ৭৫ হাজার পাউন্ড পরিশোধ করা হয়নি কখনো। ঈশ্বরের হাত গোল সম্পর্কিত ইন্টারভিউয়ের চুক্তি আর তার সম্মানী নিয়ে সেই গল্প নিয়ে আরেকটি লেখা প্রকাশ করা হবে। বোনাস হিসাবে দেখুন ম্যারাডোনার হাতের স্বাক্ষর।

ঈশ্বরের হাত গোল

ম্যারাডোনার স্বাক্ষর :: দিয়েগো ১০ নম্বর ::

কিভাবে হয়েছিল ঈশ্বরের হাতে গোল দেখুন ইউটিউব ভিডিওতে,

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top