খেলাধুলা

ফুটবল বিশ্বকাপের যত বল (১৯৩০-২০১৮)

ফুটবল বিশ্বকাপের যত বল (১৯৩০-২০১৮)

১৯৩০ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসর থেকে শুরু করে যত বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছে সব সময়ই ফিফা অথবা আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল কিভাবে বলটিকে আরো নিখুঁত ও চমৎকার করে তৈরী করা যায়। গত ২০টি বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে বিভিন্ন রংঢং ও বাহারি নামে বিবর্তিত হয়েছে বলের নকশা। আসুন ফুটবল বিশ্বকাপের যত বল (১৯৩০-২০১৮) ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

T-modelFederale 102AllenSuperballSwiss World ChampionTop StarCrackSlazenger Challengeadidas Telstaradidas Telstar Durlastadidas Tango Durlastadidas Tango Espanaadidas Aztecaadidas Etrusco Unicoadidas Questraadidas Tricoloreadidas Fevernovaadidas Teamgeistadidas Jabulaniadidas Brazucaadidas Telstar 18
<
>
১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে বল সুইশ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন

টি-মডেল

১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে সর্বপ্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে (তখন অবশ্য টুর্ণামেন্টের নাম ছিল জুলেরিমে কাপ) ব্যবহৃত হয়েছিল ইংল্যান্ডের তৈরি টি-মডেল বল। মজার বিষয় হচ্ছে ফাইনালে অংশগ্রহণকারী স্বাগতিক উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনা দুই দলই নিজেদের বল দিয়ে খেলার দাবি জানায়। পরে দু অর্ধে দুটি বল নিয়ে ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ফেডারেল ১০২ ও অ্যালেন

১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসর আয়োজিত হয় ইতালিতে। ইতালির শাসক মুসোলিনি জানান যে তার দেশে আয়োজিত বিশ্বকাপে খেলা হবে ইতালিতে তৈরী বল দিয়েই। তৈরী হয় “ফেডারেল ১০২” বল যাতে ছিল ১৩টি পৃথক প্যানেল। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপেও প্রায় একই নকশার আদলে তৈরী হয় “অ্যালেন”।

সুপারবল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১২ বছরের বিরতির পর ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী আসর। সে আসরে ব্যবহৃত হয়েছিল “সুপারবল” নামের বল, যার প্রস্তুতকারক ছিল আর্জেন্টাইন প্রতিষ্ঠান তোসোলিনি। বলটির বিশেষত্ব ছিল এই যে বলের ভিতরে থাকে ব্লাডার নামক একটি থলে, যাতে বাতাস পরিপূর্ণ করলে বলের আকৃতিও পরিবর্তিত হয়। তাছাড়া এটিই ছিল বিশ্বকাপে সর্বপ্রথম জোড়া চামড়ার বল।

সুইশ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন, টপস্টার, ক্র্যাক ও শ্ল্যাজেঞ্জার

পূর্বে ব্যবহৃত বলগুলো ১২/১৩ প্যানেলের হলেও ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে বলের ডিজাইনে প্রথমবারের মত ছিল ১৮টি প্যানেল। বলটি নাম রাখা হয়েছিল “সুইশ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন”। পরবর্তী ১৯৫৮ সালে সুইডেনে আয়োজিত আসরে ব্যবহৃত বলের নাম ছিল “টপ স্টার”। এ বলটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল মসৃণ জলরোধক উপরিভাগ। ১৯৬২ সালে চিলি আর ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপেও প্রায় একই নকশার “ক্র্যাক” আর “শ্ল্যাজেঞ্জার” নামক বল ব্যবহৃত হয়।

টেলস্টার ও টেলস্টার ডুরলাস্ট

১৯৬৩ সালে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যাডিডাস। এর আগে স্বাগতিক দেশগুলোই বিশ্বকাপের জন্য বল তৈরী করলেও ১৯৭০ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিই বিশ্বকাপের বল নিয়মিত তৈরী করে থাকে। ১৯৭০ সালের “টেলস্টার” নামক বলটির মূল বিশেষত্ব ছিল লেদার অর্থাৎ চামড়া দিয়ে তৈরি ৩২টি প্যানেল; এর মধ্যে ১২টি কালো ও বাকি ২০টি সাদা। প্রথমবারের মত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত মেক্সিকো বিশ্বকাপের বল টেলস্টার নাম এসেছে টেলিভিশন ও স্টার শব্দ থেকে। সাদা ও কালো বিপরীত রঙের মিশ্রণে তৈরীর কারণে বলটি মাঠে ও টিভিতে আরও বেশি দৃশ্যমান হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের জার্মানি বিশ্বকাপেও এ বলটিই বলবৎ ছিল, তবে নাম ছিল “টেলস্টার ডুরলাস্ট”। এ বলগুলো পূর্বের বলগুলোর তুলনায় বেশ হালকা ছিল।

ট্যাঙ্গো ডুরলাস্ট ও ট্যাঙ্গো এস্পানা

১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা আর ১৯৮২ সালে স্পেনে ব্যবহৃত বলটির মূল নাম ছিল “ট্যাঙ্গো”; আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে “ট্যাঙ্গো ডুরলাস্ট” আর স্পেন বিশ্বকাপে “ট্যাঙ্গো এস্পানা” নামে ব্যবহৃত হয়। স্পেন বিশ্বকাপের ব্যবহৃত ট্যাঙ্গো এস্পানা বলটি ছিল বিশ্বকাপের প্রথম জলরোধক আর চামড়ার তৈরী সর্বশেষ বল।

অ্যাজটেকা

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ডিয়েগো ম্যারাডোনার “হ্যান্ড অফ গড” কিংবা “গোল অফ দ্যা সেঞ্চুরি” গোল আর তার একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। যে বলটি নিয়ে ম্যারাডোনা মাঠে শৈল্পিক কারুকাজ করেছিলেন সেই বলটির নাম ছিল “অ্যাজটেকা”। মূলত মেক্সিকোর প্রাচীন “অ্যাজটেক” সভ্যতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনই ছিল এ নামকরণ। এ বলটি ছিল পলিইউরোথিন দ্বারা তৈরি বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম সিনথেটিক বল।

অ্যাট্রুসকো ইউনিকো ও কোয়েস্ট্রা

ইতালিতে আয়োজিত ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্যবহৃত বলের নাম “অ্যাট্রুসকো ইউনিকো”। বলে ফোমের ব্যবহারের প্রথম নিদর্শন ছিল এটি। তাছাড়া সিনথেটিক বস্তুর পরিমাণও বেশি ছিল। সাবলীল আর গতিশীল ফুটবল উপহার দিতে সহজ হওয়ায় ফুটবলাররা এ বলটিকে আধুনিক বলের স্বীকৃতি দেন। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের বল ছিল “কোয়েস্ট্রা”। মূলত এ বলটি ছিল আগের আসরের বলটির পরিমার্জিত রূপ।

ট্রাইকালার

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপের ব্যবহৃত বলের নাম ছিল “ট্রাইকালার”। এটিতে ছিল লাল, সাদা ও নীল এই ৩টি রঙের সমাহার। এটিই ছিল বিশ্বকাপে ব্যবহৃত প্রথম রঙিন বল।

ফেভারনোভা

২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের বলটির নাম ছিল “ফেভারনোভা”। বলটি ছিল হাতে সেলাই করা বিশ্বকাপের শেষ বল। সোনালী রঙের বলটি প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ছিল পূর্বের বলগুলোর তুলনায় বেশ উন্নত।

টিমজিস্ট

২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপের বল ছিল “টিমজিস্ট”। টিমজিস্ট শব্দের অর্থ দলগত। ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে ৩২ প্যানেলের বল ব্যবহৃত হলেও এ বলটিতে ১৪ প্যানেল ব্যবহার করা হয় ফলে বলটি হয় আরো গোলাকার। গতি বাড়ায় সেই বিশ্বকাপে প্রচুর গোলের প্রত্যাশা থাকলেও সেবারের আসরের গোলগড় ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।

জাবুলানি

২০১০ সালে আফ্রিকা মহাদেশে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপের বল ছিল “জাবুলানি”, যার অর্থ উদযাপন করা। এ বলটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি ভাষা আর ১১ জন খেলোয়াড়ের সাথে মিল রেখে এটিতে ১১টি রঙের সমাহার ঘটানো হয়েছিল। টুর্ণামেন্ট শুরুর আগে ৮ প্যানেলের বলটির বেশ প্রশংসা হলেও টুর্ণামেন্ট শুরু হবার পর অস্বাভাবিক গতিবিধির জন্যে সমালোচিত হয়েছিল।

ব্রাজুকা

২০১৪ সালে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ আসর ফেরে লাতিন আমেরিকায়। আর ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় সর্বশেষ বিশ্বকাপের বল ছিল “ব্রাজুকা”, যার অর্থ ব্রাজিলিয়ান। ৬ প্যানেলের বলটির নকশায় ব্রাজিলিয়ানদের রঙিন জীবনধারার সমন্বয় ঘটে আর প্রচার বাড়াতে এ বলটির নাম সমর্থকদের ভোটে নির্বাচন করা হয়েছিল।

টেলস্টার ১৮

২০১৮ সালে রাশিয়ায় বিশ্বকাপের ২১তম আসরের বল হিসেবে থাকছে “টেলস্টার ১৮”। বিগত বিশ্বকাপের আসরগুলোতে ব্যবহৃত বলগুলোয় স্বাগতিক দেশগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্যের ছাপ রাখার চেষ্টা করা হলেও, এবার ফিফা ও অ্যাডিডাস টেলস্টারের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নতুন নকশায় বলটিকে ফিরিয়ে এনেছে। এ বলটিতে টেলিস্টারের মত সাদা কালো (বা অন্য রঙের) প্যানেল থাকলেও রঙিন প্যানেলে রয়েছে পিক্সেলের উপস্থিতি।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top